সুনামগঞ্জে ৩ মন্দির, ২ দোকান ভাংচুর

সুনামগঞ্জে ৩ মন্দির, ২ দোকান ভাংচুর


স্টাফ রিপোর্টার, প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬ ২৩:৪৫


তাহিরপুরে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দায়ে অভিযুক্ত তরুণ দীপ্ত রায় ওরপে প্রিন্স রায়কে (১৮) জেল হাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। এর আগে মঙ্গলবার রাতেই পুলিশ বাদী হয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দায়ে তার বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার দেখায়। দীপ্ত বাদাঘাট বাজার  পার্শ্ববর্তী গড়কাটি গ্রামের বাসিন্দা নিখিল রায়ের ছেলে, সে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। এ ঘটনায় তিনটি মন্দির এবং দুটি দোকান ভাংচুর হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে দীপ্ত রায়’এর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)—কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য সংবলিত একটি পোস্ট প্রচার হলে তাহিরপুরের বাদাঘাট বাজারসহ আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। বিক্ষুব্ধ লোকজন বাদাঘাট বাজারে ও গড়কাটি গ্রামের কয়েকটি দোকান ও মন্দিরে হামলা চালায়। বুধবার বিকেলে পুলিশ সুপারসহ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।



বুধবার সকালে দীপ্ত রায়ের গড়কাটি’র বাড়িতে সাংবাদিকরা গিয়ে দেখতে পান, সেখানে সুনসান নীরবতা। তার মা কেতকি রানী রায় ঘরের ভেতরে বসে কান্নাকাটি করছিলেন। তিনি জানালেন, মঙ্গলবার বিকালে শত শত মানুষ তাদের বসতঘরে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। ঘরে থাকা আসবাবপত্র, মোটর, ট্যাংকিসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে গেছে তারা।


 

তিনি বলেন, দুপুরে কয়েকজন ছেলে আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। পরে জানতে পারি, ফেসবুকে কিছু লেখার কারণে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আশপাশ এলাকার শত শত মানুষ বাড়িতে এসে ভাঙচুর চালায়। বাড়ির সামনের ভুসিমালের দোকানও ভাংচুর করে। এই দোকান দেখভাল করতেন দীপ্ত ও তার বাবা নিখিল রায়।


কেতকি রানী বললেন, ঘটনার পর থেকে তার তিন ছেলে, ছেলের স্ত্রী এবং স্বামী ভয়ে বাড়িছাড়া রয়েছেন। পরে সন্ধ্যার দিকে পুলিশ বাড়িতে আসে।

স্থানীয় মন্দিরে গিয়েও ভাঙচুরের দৃশ্য দেখা গেছে। তবে কারা এ হামলা চালিয়েছে, এই বিষয়ে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চান নি।


 

দীপ্ত রায়ের বাড়ির পাশের বাসিন্দা অরুণ রায় বললেন, তিনি পাশের বাদাঘাট বাজারে দোকানে ছিলেন। সন্ধ্যার দিকে তার বাদাঘাট বাজারের দোকানে ২০ থেকে ৩০ জন লোক ঢুকে হামলা ও ভাঙচুর চালায় বলে তিনি অভিযোগ করেন। এরপর বাজারের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দোকানপাট বন্ধ করে চলে যান।

তিনি বলেন, 


‘ঘটনার পর থেকে আমরা ভয়ের মধ্যে আছি। যে অপরাধ করেছে তার বিচার হোক, আমরাও চাই। একজনের অপরাধের জন্য যেন অন্যদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা যেন না হয়, সেদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর দেওয়া প্রয়োজন।’


 

গ্রামের স্কুল শিক্ষক রিপন রায় জানালেন, তিনি শুনেছেন দীপ্ত রায়ের মোবাইলে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবার মতো একটি ‘স্কিনশট’ ছিল। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে কেউ একজন এটি নিয়ে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। ঘটনার পর থেকে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আতঙ্কে রয়েছেন। তবে এই বিষয়ে স্থানীয় কেউ আর কিছুই জানাতে পারেন নি।



তাহিরপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং বাদাঘাট কালী মন্দিরের সাংগঠনিক সম্পাদক গণেশ তালুকদার বললেন, ঘটনার পর তিনটি মন্দির ভাংচুর করা হয়েছে। এরমধ্যে গড়কাটি কালীমন্দির, আরেকটি দুর্গা মন্দির। এই মন্দিরগুলোর সামনে থাকা ছায়া মন্দিরও (নাটমন্দির) ভাংচুর হয়েছে। এছাড়াও বাদাঘাট কালী মন্দির ভাংচুর করা হয়। 


 

তিনি জানান, মঙ্গলবার রাত আটটায় তিনি খবর পান বাদাঘাট কালী মন্দিরে হামলা করার চেষ্টা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল শিকদারকে বিষয়টি অবহিত করেন। নজরুল শিকদারও সাথে সাথেই বাদাঘাট বাজারের কালী মন্দিরে যান। ওখানে গিয়ে তিনি কাউকে পান নি মন্দিরের দরজাও বন্ধ দেখতে পান। বুধবার সকালে বাদাঘাট কালী মন্দিরে গিয়ে তিনি দেখতে পান— মন্দিরের দরজার তালা নেই। দরজা একটি রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ভেতরে ঢুকে দেখতে পান কালী প্রতিমা ভাঙা, ভোগ মন্দিরের কাঁসার থালা—বাসন কিছুই নেই। মন্দিরের অফিস কক্ষের চেয়ার—টেবিল সবই ভাংচুর করা হয়েছে। 


 

তিনি তাদেরকে জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল মন্দিরের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছেন, 


‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবার ঘটনা যে ঘটিয়েছে তাকে আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে। পরে যারা মন্দির ভাংচুর করেছেন তারাও আইনের আওতায় আসবে।’


বাদাঘাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল শিকদার বললেন,


‘রাতে বাদাঘাট কালী মন্দিরের সাংগঠনিক সম্পাদক গণেশ তালুকদার মন্দিরে ভাংচুর হতে পারে জানালে আমি সঙ্গে সঙ্গে ওখানে গিয়ে কাউকে পাই নি। এরপর আর কোন আওয়াজও শুনা যায় নি। বুধবার সকালে গণেশ তালুকদার ঘটনা জানানোর পর মন্দিরে গিয়ে অবস্থা দেখে তাহিরপুর থানার ওসিকে জানাই। পরে থানার ওসি এবং পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে আসেন। 


 

দুপুরে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন অভিযুক্ত দীপ্ত রায়ের বাড়ি, দোকান ও স্থানীয় মন্দিরসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে বাদাঘাট বাজারে আলেম—ওলামা, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, বাজার কমিটি এবং বিভিন্ন শ্রেণি— পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন।


 

মতবিনিময় সভায় পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে দীপ্ত রায়কে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আদালত তাকে জেলে পাঠিয়েছেন। প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে। তবে কাউকে অভিযুক্ত করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, পুলিশ যদি তাৎক্ষণিক তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারত, তাহলে আপনারা বিচারের দাবি জানাতেন। কিন্তু বাজারে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং অন্য ধর্মের উপাসনালয় ও বাড়িঘরে ভাঙচুর করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।


 

পুলিশ সুপার আরও বলেন, কেউ যদি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে কিংবা অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করে তাহলে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নেবে।


Link

Post a Comment

0 Comments