সুনামগঞ্জে সুদীপ্ত রায় এর ঘটনায় হিন্দু মন্দির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উগ্র মুসলিমদের আক্রমণ প্রসঙ্গে দাস কাজলের ফেসবুক পোস্ট

সুনামগঞ্জে সুদীপ্ত রায় এর ঘটনায় হিন্দু মন্দির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উগ্র মুসলিমদের আক্রমণ প্রসঙ্গে দাস কাজলের ফেসবুক পোস্ট

 ২৫ জুন ২০২৬


সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট বাজারে ২৩ জুন ২০২৬ বিকেলবেলা সুদীপ্ত রায় হয়তো ভাবেননি যে একটি ফেসবুক কমেন্ট তার গোটা জীবন ওলটপালট করে দেবে। অন্য কারো পোস্টে শুধু একটি ফটোকার্ড দিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে গুজব ছড়াল, ভিড় জমল। দোকানে আশ্রয় নিলেন তিনি। পুলিশ এসে হেফাজতে নিল। কিন্তু তারপরেও থামল না উত্তেজিত জনতা। মিছিল করে গেল তার বাড়িতে। ভাঙচুর হলো বাড়ি, দোকান, মন্দির। 


একই চিত্রনাট্য, বারবার।


এই ঘটনা নতুন নয়- এই ফাঁদ পুরনো।


মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেখেছে, ঘটনার ধরন প্রতিবার একই রকম থাকে- সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ, দ্রুত গ্রেপ্তার, জনতার একত্রিত হওয়া এবং হিন্দু পল্লিতে হামলা। অভিযোগটি সত্য কিনা সেটি যাচাই করার আগেই মব ছুটে যায়। বাড়ি জ্বলে, মন্দির ভাঙে, পরিবার পালায়। 


২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মাত্র ছয় মাসে বাংলাদেশে অন্তত ৭১টি ধর্ম অবমাননার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এই অভিযোগগুলোতে অভিযুক্তদের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি হিন্দু, এমনকি ১৫ থেকে ১৭ বছরের কিশোর-কিশোরীরাও রয়েছে। এই অভিযোগগুলোর অনেকটাই ফেসবুক পোস্ট থেকে উদ্ভূত। বহু ক্ষেত্রে পোস্টগুলো বিতর্কিত, হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট থেকে আসা, বা ডিজিটাল ফরেন্সিক তদন্তে যাচাইযোগ্য নয়। তবুও জনমানসের চাপে, কখনো কোনো প্রাথমিক তদন্তের আগেই গ্রেপ্তার করা হয়।


এই চিত্রনাট্যটা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি একটি পদ্ধতি।


১৯০১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ ছিলেন হিন্দু। ১৯৪১ সালে তা ছিল ২৮ শতাংশ। দেশভাগের পর ১৯৫১ সালে নেমে এলো ২২ শতাংশে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে আরও কমে হলো ১৩.৫ শতাংশ। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে মাত্র ৮.৫ শতাংশ। ২০২২ সালের সর্বশেষ জনগণনায় সেই সংখ্যা আরও কমে ৭.৯৫ শতাংশে নেমে এসেছে। 


১৯৬৪ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে প্রায় ৮১ লাখ হিন্দু বাংলাদেশ ছেড়ে গেছে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ লাখ ১৯ হাজার মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আবুল বারকাতের গবেষণা বলছে, ১৯৬৪ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু "নিখোঁজ" হয়ে গেছে। এরা কোথায় গেল? পালিয়ে গেছে। ভিটেমাটি ছেড়ে, পূর্বপুরুষের জমি ছেড়ে, শত বছরের শিকড় ছেড়ে।


২০০১ সালের নির্বাচনের পরের রাতের কথা মনে আছে? সেই রাতে বিএনপি কর্মীরা ধনোদোবা গ্রামে হিন্দু ও খ্রিষ্টানদের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালায়। গরু, চাল, মালপত্র লুট হয়। পরিবার পালিয়ে যায়। এই ঘটনাটি ছিল কয়েকশো ঘটনার মধ্যে একটি মাত্র।


২০১৩ থেকে ২০২১- প্রতিটি বছরে একই কাহিনি, একই অজুহাত। কখনো কুমিল্লায় দুর্গাপূজার প্রতিমার পাশে কোরআন পাওয়ার গুজবে মন্দিরে আগুন, কখনো নোয়াখালীতে সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর জ্বালানো।


২০২৪ সালের আগস্টে মাত্র ১৬ দিনে সারা দেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ২ হাজার ১০টি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে। ১ হাজার ৭০৫টি পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৫৭টি পরিবারের বাড়ি-ঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। 


২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে মব, লাশে আগুন দেওয়া হয়। এরপর শরীয়তপুরে খোকন চন্দ্র দাস, রাজবাড়ীতে অমৃত মণ্ডল, ময়মনসিংহে বজেন্দ্র বিশ্বাস নিহত হন। জানুয়ারিতে যশোরে রানা প্রতাপ বৈরাগী ও নরসিংদীতে মণি চক্রবর্তী নিহত হন। নওগাঁয় হামলাকারীদের হাত থেকে পালাতে গিয়ে মিথুন সরকার নদীতে ডুবে মারা যান।


মানবাধিকার সংস্থাগুলো ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নথিভুক্ত ঘটনায় দেখেছে, ফেসবুক পোস্ট, শ্রেণিকক্ষে মন্তব্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা ব্যক্তিগত মতপ্রকাশকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে কোনো ফরেন্সিক তদন্তের আগেই ব্যক্তি, তার পরিবার, মন্দির ও গোটা পাড়ায় সহিংস হামলা চালানো হয়েছে। 


২০২৫ সালের জুলাই মাসে রংপুরের বেতগাড়ি ইউনিয়নে একজন ১৭ বছর বয়সী কিশোরকে গ্রেপ্তারের পরে অন্তত ২২টি হিন্দু পরিবারের বাড়ি ধ্বংস করা হয়। অর্থাৎ একটি অপ্রমাণিত অভিযোগ, একজন কিশোরকে কারাগারে পাঠানো হলো এবং গোটা পাড়া উজাড় হয়ে গেল। 


সবার চোখের সামনে ঘটছে এই জাতিগত বিলুপ্তি। যে জাতির মানুষ ১৯৪৭ সালে জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল, তারা আজ মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৭ শতাংশেরও কম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় ছিল পাঁচজনে একজন, ত্রিশ বছর পরে দশজনে একজনেরও কম। 


প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার হিন্দু স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাচ্ছেন। এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি প্রতিটি বছর প্রায় একটি মাঝারি শহরের সমতুল্য একটি জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদের কথা বলছে। এরা সবাই কি স্বেচ্ছায় যাচ্ছে? নাকি এই যাওয়া আসলে একটি নীরব পলায়ন?


আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?


সুনামগঞ্জের ঘটনায় যুবদল নেতা মাহবুব মল্লিক বলেছেন, "কেউ যাতে হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা না করতে পারে আমরা সজাগ আছি।" এই কথাটুকু শুনতে ভালো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কথা বলতে হচ্ছে কেন? প্রতিবার এমন কথা বলতে হচ্ছে কেন? প্রতিবার হামলার পরেই কেন সচেতনতার কথা মনে পড়ছে?


আমরা বহুদিন আগে থেকেই বলে আসছি- ইসলামপন্থী নেটওয়ার্কগুলো পদ্ধতিগতভাবে মিথ্যা ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর উপর ক্ষমতা দেখাতে, সামাজিক বিভাজন তৈরি করতে এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এবং এই ধারাটি ৭৫ বছর ধরে চলছে। ৩৩ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে নেমে আসা একটি সম্প্রদায়ের কাছে প্রশ্ন একটাই: বাকি যারা আছেন, তারা কতদিন টিকে থাকতে পারবেন?


সুদীপ্ত রায়ের মন্দিরের মেঝেতে যে ভাঙা মূর্তির টুকরো পড়ে আছে, সেটা শুধু একটি মূর্তির টুকরো নয়। সেটা একটি সভ্যতার টুকরো, যেটা প্রতিদিন একটু একটু করে ভাঙছে এবং পৃথিবী দেখছে।


Link

Post a Comment

0 Comments