‘পেরিপ্লাস’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, “হাজার হাজার বছর আগে বাংলার রেশম, গাঙ্গেয় জটামাংসী ক্রয়ের উদ্দেশ্যে রোমের বাণিজ্যতরী ‘গঙ্গে’ (তাম্রলিপ্ত) বন্দরে আসত।” সুদূর অতীতে বাঙালীর বহির্বাণিজ্য অথবা সমুদ্রবাণিজ্যের বিপুল প্রসারতা আজও ঐতিহাসিকদের কাছে পরম বিস্ময়ের। সেই কোন সুদূর ইউফ্রেটিস নদীর পাড়ে অতীতের ব্যাবিলিনের পরাক্রমশালী নৃপতি ‘আর বাগাসের’ রাজপ্রাসাদের অস্থিচূর্ণ রেণু রেণু হয়ে মিশে গিয়েছে, সেই ধ্বংসস্তুপের ভেতরে কোথা থেকে সেগুন কাঠের বর্গা এসেছিল? ব্যবিলনের শূন্যোদ্যানের সৃষ্টিকার আরেক রাজা ‘নেবুকাডনেজারের’ (৬০৪-৫২৬ খৃষ্টপূর্ব) চন্দ্রদেবতার মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ভেতরে কোথা থেকে সুগন্ধী চন্দন কাঠের টুকরো এসেছিল? অতীতের ব্যবিলনের ধনী-বিলাসীদের ব্যবহৃত বস্ত্ৰতালিকার ভেতরে বাংলার বড় আদরের আর গৌরবের সেই মসলিনের নাম কেন দেখতে পাওয়া যায়? এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এবং অ্যাসিরিও-বিশেষজ্ঞ ‘ডক্টর সেস’ জানিয়েছিলেন যে, খৃষ্টের জন্মের প্রায় তিন হাজার বছর আগে থেকেই ব্যবিলনের সঙ্গে ভারতের ব্যবসাবাণিজ্য চলত। বৌদ্ধদের ‘বেবারুজাতকে’ও দেখা যায় যে, সেকালের হিন্দু বণিকেরা ‘দিশাকাক’, অর্থাৎ দিক নির্ণয়কারী কাক আর ময়ূর নিয়ে ব্যবসা সুদূর ব্যবিলনে ব্যবসা করতে যেতেন। বহু যুগ আগে থেকে প্রচলিত জাতকের কাহিনীগুলিতে ভারতীয় সদাগরদের সমুদ্রবাণিজ্যের আভাস পাওয়া যায়। প্রাচীন মিশরের একটি প্রাচীন শিলালিপিও বলে যে, খৃষ্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগে সেখানে আবিসিনিয়া আর সোমালিল্যাণ্ড থেকে আবলুশ কাঠ, হাতীর দাঁত আর ভারতীয় কার্পাসজাত সুদৃশ্য বস্ত্রসম্ভার রপ্তানী করা হত। তখন ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে জাহাজ বোঝাই করে আবলুস কাঠ, হাতীর দাঁত ইত্যাদি আবিসিনিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকার আরও অন্যান্য দেশে নিয়ে যাওয়া হত। তবে শুধু পূর্ব আফ্রিকা নয়, শুধু ব্যবিলন নয়, অতীতে রোমের সঙ্গেও ভারতের যে ব্যবসাবাণিজ্য চলত, সেটার প্রমাণ দাক্ষিণাত্যের মাটি খুঁড়ে পাওয়া রোমের রাজকীয় মুদ্রাতেও জ্বলজ্বল করছে বলে দেখা যায়; যা আজও মাদ্রাজ গভর্ণমেন্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। পেরিপ্লাসেও সেকালের দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে রোমের বাণিজ্যের বিপুল বিস্তারের চমকপ্রদ ইতিবৃত্ত পাওয়া যায়। সেকালের পৃথিবীর আরও দূর-দূরান্তরের দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের যোগসূত্রের নির্ভুল স্বাক্ষর আজও ‘ভিনিসেন্টের’ লেখা প্রাচীন ভারতের ব্যবসার ইতিহাসে; ‘প্লিনি’, ‘টলেমি’র আর ‘স্ট্রাবো’র গ্রন্থে ছড়িয়ে রয়েছে বলে দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া ভারতের পথে-প্রান্তরে পাহাড়ের গায়ে কুড়িয়ে পাওয়া অসংখ্য শিলালিপি ও তাম্রশাসনেও সেকালের সেই গৌরবময় বাণিজ্যের ইতিবৃত্ত পাওয়া যায়।
এখন প্রশ্ন হল, তখন যে দুঃসাহসী হিন্দু বণিকেরা উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ব্যবিলনে, গ্রীসে, রোমে, সিরিয়ায় পৌঁছে যেতেন; যাঁদের বিপুল গৌরবের ঐতিহ্য বেদের সামগানে অনুরণিত হতে দেখা যায়, তাঁদের ভেতরে বাঙালী কারা ছিলেন? সত্যিই কি পরবর্তীকালের বাঙালী সদাগরদের রক্তধারায় সেই সুদূরকালের গৌরবোজ্জ্বল হিন্দু বণিকদের কোন ঐতিহ্য ছিল না? বর্তমান সময়ের বাঙালী সওদাগরেরা কি কিছুতেই সেই হিন্দু বা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের উত্তরাধিকারী বলে নিজেদের দাবী করতে পারেন না? ভারতের ইতিহাসের গোড়ার দিকে বাঙালীর অস্তিত্ব অত্যন্ত অস্পষ্ট, অন্ধকারের যবনিকায় আচ্ছন্ন বলে দেখতে পাওয়া যায়। সেই ঘন অন্ধকারে ভেতরে খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে প্রথমবারের জন্য বাঙালী ঝিলক দিয়ে উঠেছিল, যখন গ্রীকবীর আলেকজাণ্ডার ভারত অভিযানে এসেছিলেন। মানবসভ্যতার আদিগুরু জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ ‘অ্যারিস্টোটলের’ যোগ্য শিষ্য আলেকজাণ্ডার শুধু যে রণনিপুণ আর দুর্দ্ধর্ষ সৈন্যদল নিয়ে পৃথিবী জয় করতে বেরিয়েছিলেন তা নয়। তাঁর সঙ্গে গ্রীক ঐতিহাসিক, উদ্ভিদ ও প্রাণীতত্ত্ববিদ, ভূগোলবিশারদ প্রমুখরাও ছিলেন। অ্যারিস্টোটলের নির্দেশ ছিল যে, নতুন নতুন দেশের মাটি, মানুষ, গাছপালা ইত্যাদি যাবতীয় জ্ঞাতব্য তথ্য উত্তরসূরীদের জন্য লিখে রাখতে হবে। তাই গ্রীক ঐতিহাসিক ‘ডিয়োডোরাস’, ‘প্লুটার্ক’, ‘কার্টিস’ লিখিত আলেকজাণ্ডারের ভারত অভিযানের ইতিহাস থেকেই প্রথম গঙ্গারিডি বা গঙ্গারাষ্ট্রের কথা জানতে পারা যায়। কার্টিস বলেছিলেন, “... তারপরেই দেখা গেল গঙ্গা - ভারতের সবচেয়ে বড় নদী। তার ওপারে প্রাচী (Prasii) এবং গঙ্গারিডাই (Gangaridhi) নামে দুটো শক্তিশালী জাতির বসবাস।” ডিয়োডোরাস আরও খবর জানিয়ে লিখেছিলেন, “সিন্ধুর ওপারেও এক বিশাল সমৃদ্ধিশালী দেশের অস্তিত্ব জানতে পারা যায়। সিন্ধু নদী পেরিয়ে গেলেই প্রকাণ্ড একটা মরুভূমি পাওয়া যাবে। সেই মরুভূমি পেরোতে বারো দিন লাগবে - তারপরেই আছে এক নদী - তার নাম হল গঙ্গা। সেই গঙ্গার ওপারেই রয়েছে দুর্দ্ধর্ষ শক্তিধর গঙ্গারিডি রাজ্য। সেখানকার রাজার বিশ হাজার ঘোড়া, দুই লক্ষ পদাতিক, দুই হাজার রথ, এবং চার হাজার রণহস্তী রয়েছে।” আর প্লুটার্ক তাঁর লেখায় আরও বাড়িয়ে গঙ্গার ওপারে অবস্থিত গঙ্গারিডাই রাজার সৈন্যসামন্তের কথা, দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজাণ্ডারকে প্রতিহত করবার জন্য বিপুল রণসম্ভার নিয়ে তাঁদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন। ভারতের প্রাচীন ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ‘ম্যাক্রিণ্ডল’ তো স্পষ্টই বলেছিলেন যে, আধুনিক কালের নিম্নবঙ্গই অতীতে গঙ্গারিডাই জাতির বাসস্থান ছিল - “The Gangaridae or Gangarides occupied the region corresponding roughly with that now called Lower Bengal.” এছাড়া তিনি আরও বলেছিলেন যে, গঙ্গারিডাই বহু জাতির সংমিশ্রণ, এবং তাঁরা ধীরে ধীরে আর্য ভাবধারায় প্রভাবিত হচ্ছে। সেকালের বিদেশী ঐতিহাসিকদের উল্লিখিত সেই গঙ্গারিডাই যে আধুনিককালের পশ্চিমবঙ্গ - সেটার আভাস ম্যাক্রিণ্ডল সংগৃহীত এই ঐতিহাসিক তথ্যটুকুর ভেতরে পাওয়া যায় - “Region of Ganges was inhabited by two principal nations. Prasii and Gangaridae. Mde-St-Martin thinks that their name has been preserved almost identically in that of Gonghris of South Bihar whose traditions refer their origin to Tirhut and he would identify their royal city Parthalis (or Portalis) with Vardhana (contraction of vardhamana), now Burdwan ... In Ptolemy, their capital is Gange …” গঙ্গারিডাই নামটা দক্ষিণ বিহারের ‘গঙ্গহ্রী’ নামের জাতি থেকেই আসুক, বা তাঁদের আদিনিবাস তিরহুতেই হোক - তাঁরা আদতে যে গাঙ্গেয় ভূমির সন্তান, এবং হৃষ্টপুষ্ট সবল কুশলী যোদ্ধার জাত ছিলেন - সেটা ঐতিহাসিক সত্য। কেন না, যাঁদের জন্য দিগ্বিবিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে গ্রীকবীরকে ফিরে চলে যেতে হয়েছিল; যাঁদের রণনিপুণ অশ্ব, গজ ও পদাতিক সেনাবাহিনীর এত বিস্ময়কর প্রসারতা নির্ভুলভাবে ধরতে পারা যায়; তাঁদের নেপথ্যে যে, দৃঢ় ও সুসংবদ্ধ এবং সমৃদ্ধিশালী একটি রাষ্ট্র ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আর বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য পৃথিবীর কোন দেশই রাতারাতি নিজের বিপুল রণসম্ভার নিয়ে প্রস্তুত হতে পারে না, এবং পৃথিবীর যে কোন দেশেই যে কোনকালে রাজস্বের একটা মোটা অংশ দিয়েই সামরিক শক্তিকে পুষ্ট করে তোলা হয়। তাই নিঃসন্দেহে ধরা যায় যে, আলেকজাণ্ডারের ভারত আগমনের বহু বহু বছর আগেই প্রাচীন গঙ্গারিডি বা বঙ্গদেশ বিদ্যায় আর সংস্কৃতিতে, ব্যবসায় আর বাণিজ্যে খুবই উন্নত ছিল। অথচ ভারতীয় বণিকদের সেই গৌরবোজ্জ্বল সমুদ্রবাণিজ্য, পৃথিবীর দেশে দেশে নিজেদের দেশের সংস্কৃতি ও ধ্যানধারণাকে ছড়িয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব, সেই সোনার ইতিহাসের কোথাও কিন্তু বাঙালীর নাম পাওয়া যায় না। কিন্তু অতীতের ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যের সেই গৌরবদীপ্ত ইতিহাসে বাঙালী বণিকদেরও যে অস্তিত্ব ছিল, সেটার অস্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়। ‘উইলিয়ম ভিনিসেন্টের’ লেখা ‘কমার্স অ্যাণ্ড ন্যাভিগেশান অফ দি এনসিয়েন্ট ইণ্ডিয়ান নেশন্স’ গ্রন্থটি এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তাতে অতীতের তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে বাঙালীর ব্রহ্মদেশে, মালয়ে, সিংহলে, চীনে এবং দূরপ্রাচ্যে বাণিজ্য করতে যাওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়। কিন্তু উক্ত গ্রন্থ অনুসারে তখন রোমে, ব্যবিলনে ও আফ্রিকায় মালবার উপকূলে অবস্থিত বারিগাজা (Barigaza) বন্দর থেকে ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজগুলি যাতায়াত করত। তাহলে তখন কি করমণ্ডল উপকূলের জাহাজগুলোর মালবার অর্থাৎ পশ্চিম উপকূলে যাওয়ার ব্যাপারে কোন বিধিনিষেধ ছিল? নাকি, তখন যাঁরা উত্তাল ও রাক্ষুসে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে চীনে যেতেন, সুবর্ণভূমিতে যবদ্বীপে যেতেন, তাঁরা কি রোমে অথবা ব্যবিলনে যেতে পারতেন না? উত্তরটা একই বইতে রয়েছে, সেখানে একটি ছত্রে লেখা হয়েছে - “A trade regularly carried on by native traders, between Malabar and Coromandel coasts”, আর ‘মনোক্সিল’ (Monoxyle) নামের বিশেষ এক ধরনের পণ্যবাহী জাহাজ তখন দুই উপকূলেই যাতায়াত করত। সেই সময়ে গাঙ্গেয় উপত্যকা, অর্থাৎ প্রাচীন বাংলার সওদাগরেরা পশ্চিমের বন্দরে মসলিন বিক্রি করে সেখান থেকে মশলা নিয়ে আসতেন। তারপরে সেই অপূর্ব সুন্দর মসলিন বস্ত্রসম্ভার আরব সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সুদূর রোমে, ব্যবিলনে পৌঁছে যেত। তাহলে নিশ্চয়ই, সেকালের বঙ্গভূমির পণ্যের সঙ্গে গঙ্গারিডাই জাতীয় ব্যবসায়ীরাও যে থাকতেন; তাঁরা যে দূর বিদেশে পথে-প্রান্তরে উপাসনালয় গড়তেন, সেখানে নিজেদের আচার-ব্যবহার আর ধর্মবিশ্বাস ছড়িয়ে দিয়ে আসতেন - এগুলোও কোন কষ্ট কল্পনা নয়। বেদে, পুরাণে, মনুসংহিতায়, বরাহপুরাণে, বোধায়নসূত্রে, ধর্মসূত্রে সেকালের হিন্দুদের সমুদ্রবাণিজ্যের উল্লেখের কোন দৃঢ় ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই; ‘রঘুবংশ’ ‘দশকুমারচরিত’, ‘কথাসরিৎসাগর’ ইত্যাদি সংস্কৃত সাহিত্যের বিভিন্ন কাব্যে, নাটকে সেকালের বাণিজ্যের কোন সাল তারিখ নেই; তাই ঐতিহাসিকেরা সেকালের বাঙালীর বহির্বাণিজ্যের ইতিহাস গ্রীক ইতিহাসবিদদের লিখিত সেই গঙ্গারিডি বা নিম্নবঙ্গের সমৃদ্ধির ইতিবৃত্ত থেকেই শুরু করে থাকেন। কিন্তু পেরিপ্লাসে বলা হয়েছে যে, সেই সুদূর কুয়াশাচ্ছন্ন বৈদিক যুগ থকেই তাম্রলিপ্ত অথবা গঙ্গে বন্দরের খ্যাতি অম্লান ছিল। আর সেই তাম্রলিপ্তকে যদি গঙ্গাতীর সন্নিহিত গঙ্গারিডি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা যায়, তাহলে তখনকার বৈদেশিক বাণিজ্যে যে ভারতীয় বণিকেরা তাঁদের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন, তাঁরাই পরবর্তী বাঙালী ব্যবসায়ীদের পূর্বসূরী ছিলেন - এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই বাঙালীর বহির্বাণিজ্যের ইতিহাসকে বিচার করতে হবে।
ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রসঙ্গে, ভারত ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ‘পি. টি. শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার’ জানিয়েছিলেন যে, খৃষ্টপূর্ব ছ’হাজার বছরের প্রাচীন একটি মিশরীয় শিলালিপিতে, সেদেশে ভারতের হাতীর দাঁত, কাঠ আর কার্পাসের খুব কদর ছিল বলে জানতে পারা যায়। ভারতের পশ্চিম উপকূলস্থিত বারিগাজা (Barigaza) বন্দর থেকে ভারতীয় পণ্যসম্ভার তখন জাহাজ বোঝাই হয়ে আফ্রিকায় চলে যেত। সেই সময়ে হয়তো দুই উপকূলের বন্দরে বন্দরে চলাচলকারী সেই ‘মনোক্সিল’ (Monoxyle) জাহাজে করেই আফ্রিকায় পণ্য রপ্তানী করা হত। তারপরে আফ্রিকা থেকে দূর দূরান্তরের দেশে ভারতের তথা বঙ্গদেশের সেইসব বিচিত্র পণ্যবস্তু ছড়িয়ে পড়ত। খৃষ্টের জন্মের শত শত শতাব্দী আগে বঙ্গদেশের আবলুস কাঠ আবিসিনিয়ায়, সোমালিল্যাণ্ডে রপ্তানী করা হত। পূর্ব আফ্রিকার নগরে বন্দরে তখন বঙ্গদেশে তৈরী তলোয়ার, কুড়াল, রঙিন এবং সাদা কাপড় উচ্চমূল্যে বিক্রী করা হত। সেকালে আবিসিনিয়ার হস্তী শিকারীরা গভীর জঙ্গলে শিকার করতে যাওয়ার আগে ভারতীয় অস্ত্র পেলে খুব খুশি হতেন। বাঙলায় তৈরী কাটারির খ্যাতি সম্বন্ধে তাঁরা নিঃসন্দেহ ছিলেন। মিশর এবং দক্ষিণ আর পূর্ব আফ্রিকা থেকে বাঙালী বণিকেরা তখন বিভিন্ন সুগন্ধি গন্ধদ্রব্য নিয়ে আসতেন। সেই সময়ে বঙ্গদেশের রমণীরা যেমন মিশরীয় অগুরু ব্যবহার করতেন, তেমনি সেই সুদূর পুরাকালে রাজা ‘সোলেমান’ মহীশূরের অরণ্যের চন্দন কাঠের সুগন্ধে অভিভূত হয়েছিলেন। সুদূর অতীতে আরবীয় বণিকেরা উটের পিঠে করে ভারে ভারে ভারতের সুগন্ধি চন্দন কাঠ নিয়ে মিশরে, সিরিয়ায় পৌঁছে যেতেন। কিন্তু শুধু চন্দন কাঠ দিয়েই তখন মিশরের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চলত না। ভারত থেকে তখন বহু মূল্যবান পাথর, মণিমুক্তা, হস্তীদন্ত, বানর আর ময়ূরও মিশরে নিয়ে যাওয়া হত। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, দেশ-দেশান্তরে সেই প্রাচীন বাণিজ্য বিস্তারে দুটো দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহারের আদান-প্রদানও অত্যন্ত নিবিড়ভাবে হয়েছিল। সেকালে মিশরের ভাষা ছিল হীব্রু। ভারতের অনেক জিনিসের নামের মধ্যে হীব্রু নামের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়, যেমন বানরকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় ‘কপি’, আর হীব্রুতে বলা হয় ‘কাফ’। হাতীর দাঁতের ইংরেজি হল ‘আইভরি’, সংস্কৃতে সেটাই ‘ইভাদন্ত’, কিন্তু হীব্রুতে সেটাই আবার ‘শেন হেভেরিয়ান’। ইভাদন্ত থেকেই হীব্রু ‘শেন হেভেরিয়ান’ কথাটা এসেছে কিনা সেটা বলা কঠিন; তবে সেকালের ভারতের সংস্কৃত ভাষা-ভাষী মানুষের সঙ্গে মিশরের সিরিয়ার মানুষদের যে দৈনন্দিন যোগাযোগ ছিল, সেটা কোন আনুমানিক তথ্য নয়। শুধু ভাষা নয়, সংস্কৃতি নয়, মিশরীয় উপকথার ভেতরেও ভারতীয় পুরাণের কাহিনী মিশে রয়েছে বলে দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ‘কর্নেল উইলফোর্ড’ লিখেছিলেন, “মিশরের বৃদ্ধ পুরোহিত আর গ্রামবৃদ্ধরা প্রাচীন উইলোগাছের শান্ত ছায়ায় বসে ভারতের মহাভারত আর রামায়ণের কথা আলোচনা করতেন।” তিনি আরো বলেছিলেন, সেকালের “হিন্দু বণিকেরা, বাঙালী সওদাগরেরা তাঁদের ব্যবহারিক জ্ঞানকে, নিজেদের দেশের অতীত ঐতিহ্যের ইতিহাসকে মিশরের সিরিয়ার চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।” কিন্তু সেই সুদূর দেশে বাণিজ্য বিস্তার আর সাংস্কৃতিক ভাবধারার বিনিময় তখন একেবারে বাধাহীন হয়নি। অনেক বাধা, অনেক ঝড়-দুর্যোগের সঙ্গে দু’হাতে পাঞ্জা লড়ে বণিকদের অগ্রসর হতে হয়েছিল। ভারতের সঙ্গে মিশরের ও আফ্রিকার বাণিজ্যিক সম্বন্ধ যখন উত্তরোত্তর বর্ধিত হতে শুরু করেছিল; মিশর ও আফ্রিকার বাজার যখন ভারতের পণ্যসম্ভারে ছেয়ে গিয়েছিল; তখন আরবীয় জলদস্যুরা তাতে আঘাত হেনেছিল। সেই সময়ে ভারত থেকে মিশরের প্রধান বাণিজ্যপথ ছিল লোহিত সাগর আর পারস্য উপসাগর হয়ে। আরবীয় জলদস্যুদের উপদ্রবে সেই পথ দুটি ক্রমেই বিপদ সংকুল হয়ে উঠেছিল। শেষপর্যন্ত মিশর আর আফ্রিকা যাওয়ার সংক্ষিপ্ত পথ লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর আর ভারতীয় বণিকদের কাছে এতটুকু নিরাপদ বলে মনে হয়নি। কিন্তু তারপরেও তাঁরা সেদিকে বাণিজ্য করবার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন। বেদ, মনুসংহিতার কাল থেকে যাঁরা সমুদ্র পার করে বিদেশে বাণিজ্য করতে যেতেন, যে দেশের শিশুরা মায়ের কাছে শুয়ে সওদাগরদের সমুদ্র যাত্রার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তেন, তাঁরা কিছু জলদস্যুর ভয়ে তাঁদের রক্তধারায় প্রবাহিত দুঃসাহসের অহঙ্কারকে কিছুতেই বিসর্জন দিতে রাজী হননি। কিন্তু মূল সমস্যা দাঁড়িয়েছিল লোকক্ষয় নিয়ে। এছাড়া হিমালয়ের তরাইয়ের শালকাঠ, মহীশূরের অরণ্যের হাতীর দাঁত আর রেশমের অপূর্ব বস্ত্রসম্ভার বারে বারে সমুদ্রের জলে বিনষ্ট করতেও ভারতীয় বণিকেরা রাজী ছিলেন না। তাই তাঁরা বাণিজ্যের জন্য নতুন পথ খুঁজতে শুরু করেছিলেন। সেদিনের ভারতের সওদাগরদের, বাঙালী বণিকদের সেই দুশ্চিন্তার কথা, নতুন জলপথে নির্বিঘ্নে বাণিজ্য করবার উপায় বের করবার সেই বিচিত্র ইতিবৃত্ত, শ্রীনিবাস আয়েঙ্গারের প্রবন্ধে পাওয়া যায়। তিনি লিখেছিলেন, “By sailing straight to Abyssinia with the help of monsoon, the Indian traders avoided the rapacious pirates of Arabia, who from ancient times dominated the Persian gulf and the Red Sea and prevented Indian goods from being taken straight to Egyptian markets.” সেই সিদ্ধান্তের ফলাফল সুদূর প্রসারী হয়েছিল। সেবারে ভারতীয় সওদাগরদের আরব জলদস্যুরা আর বাধা দিতে পারেনি। বরং, আরবীয় জলদস্যুদের বাধা পেয়েই তাঁদের ওপরে বাণিজ্য-লক্ষ্মীর অকৃপণ আশীর্বাদ ঝরে পড়েছিল। সেকালে মিশর ও ব্যবিলনের সঙ্গে ভারতের ব্যবসাবাণিজ্য যে প্রবলভাবে চলত, সেটার প্রমাণ বিখ্যাত অ্যাসিরিও বিশেষজ্ঞ ডক্টর সেসের লেখায়, মিস্টার জে. কেনেডির প্রবন্ধে, এবং জাতকের বিভিন্ন কাহিনীতে পাওয়া যায়।
এবারে পূর্ব-উপকূল থেকে চীনের সঙ্গে বাঙলার বাণিজ্যের আলোচনায় আসা যাক। ‘ত্রিপিটকে’, ‘মহাবংশে’, ‘জাতকে’ এবং প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের বিভিন্ন কাব্যে নাটকে চীনের সঙ্গে বাঙলার বাণিজ্যের অস্পষ্ট আভাস পাওয়া গেলেও সেগুলোর ঐতিহাসিক ভিত্তি কিন্তু অটল নয়। অতীতে অধ্যাপক ‘ল্যাকোপেরি’ (Lacouperi) তাঁর একটি প্রবন্ধে জানিয়েছিলেন যে, খৃষ্টপূর্ব ৬৮০ অব্দে ভারতের হিন্দু বণিকেরা চীনের কোন জায়গায় নিজেদের একটা উপনিবেশ স্থাপন করেছিলেন। সেই সওদাগরেরা যে জাহাজগুলোতে তাঁদের পণ্যসম্ভার নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই জাহাজগুলোর দুইদিকের অগ্রভাগের গঠন অনেকটা পাখীর ঠোঁটের মত ছিল। ‘যুক্তিকল্পতরু’তেও ঠিক সেরকম তরী নির্মাণের স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায়। পেরিপ্লাসেও বলা হয়েছে যে, সেকালে ‘কোলান্দিয়া’ নামের একধরনের জাহাজ বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে সিংহলে, চীনে যেত। ম্যাক্রিণ্ডলও অনুমান করেছিলেন যে, ওই কোলান্দিয়াই চীনের উপকূলে বাণিজ্য করতে যেত। সেই সুপ্রাচীনকালের বেশির ভাগ সমুদ্রগামী তরীর দুইদিকের অগ্রভাগ পাখীর ঠোঁটের মত সরু হত। হয়ত কোলান্দিয়ার আকৃতিও যুক্তিকল্পতরুর নির্দেশ অনুযায়ীই ছিল। আর সেই কারণেই চীনে উপনিবেশ স্থাপনকারী সেই হিন্দু বণিকেরাই যে বাঙালী সওদাগরদের অতীত বংশধর ছিলেন, এটা স্বীকার করতে হলে কোন দূর বিসর্পিল কল্পনার আশ্রয় নিতে হয় না। আর সেই স্মরণাতীত কাল থেকে যে গঙ্গে বা তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যে বাঙালী বুদ্ধিজীবি, পুরোহিত, শিল্পী ও কারিগরেরা দলে দলে চীনে গিয়েছিলেন, চীনের পথে-প্রান্তরে, মন্দিরের পাথরে পাথরে উৎকীর্ণ করা বঙ্গদেশের বাণিজ্যযানের অবিকল প্রতিকৃতিতে, এবং চীনা পরিব্রাজকদের বিবরণীতে সেসবের প্রমাণ পাওয়া যায়।
‘ফা-হিয়েন’, ‘য়ুয়ান চোয়ান’ এবং ‘ই-ৎ-সিঙ’ - স্বনামধন্য এই তিন বৌদ্ধ ভিক্ষুর বর্ণনায় একটি ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে অতীতের তাম্রলিপ্ত বন্দরের সমারোহের কথা পড়ে সহজেই কল্পনা করতে পারা যায়। বাঙালীর বহির্বাণিজ্য সেই সুদূর অতীতকাল থেকেই খুব সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু সেই বিদেশী পরিব্রাজকেরা কেউ চতুর্থ, তো কেউ সপ্তম শতকে ভারতে এসেছিলেন। তার আগে, অর্থাৎ খৃষ্টের জন্মের আগের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন অতীতে চীনা সওদাগরদের দল কি বাংলায় আসতেন না? পেরিপ্লাসও এই বিষয়ে কোন আলোকপাত করতে পারেনি। সেখানে এই বিষয়ে শুধু দ্বিধাগ্রস্ত একটি উক্তি পাওয়া যায় যে, হয়তো খৃষ্টাব্দ শুরু হওয়ার বহু আগে থেকেই চীনা সিল্ক তিব্বত ডিঙিয়ে ব্রহ্মপুত্রের উপত্যকা ও আসাম পেরিয়ে পূর্ব-বাঙলা হয়ে গঙ্গার মোহনায় তাম্রলিপ্তে এসে পৌঁছাত। পরবর্তীকালে অবশ্য বঙ্গদেশে চীনা সিল্কের আমদানীর অনেক নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায়। এছাড়া সেই সময়ের বঙ্গদেশের গঙ্গার উপকূল থেকে চীনে প্রচুর পরিমাণে তেজপাতা (Malabathrum), জটামাংসী (Genetic spikenard), মসলিন আর কচ্ছপের খোল (Tortoiseshell) ও নীল রঙের সুদৃশ্য পাথর রপ্তানীর তথ্যনির্ভর ইতিহাসও পাওয়া যায়। গঙ্গার বয়োবৃদ্ধ কচ্ছপের শক্ত খোল রঙ করে চীনা শিল্পীরা তাঁদের নিপুণ অঙ্গুলী বিন্যাসে তখন টুকিটাকি ঘর বিন্যাসের সামগ্রী তৈরী করতেন। সেই সময়ে শুধু সমুদ্রপথে নয়, স্থলপথেও স্মরণাতীতকাল থেকেই চীনের সঙ্গে বাঙলার যে ব্যবসাবাণিজ্য চলত, ভারতে চীনের রাষ্ট্রপ্রতিনিধি ‘চ্যাং-কিয়েনের’ (Chan-Kien) একটি উক্তি থেকেও সেটার আভাস পাওয়া যায়। উক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ১২৬ খৃষ্টপূর্বাব্দে উ-চি প্রদেশে ছিলেন। তিনি ব্যাকট্রিয়ার (উত্তর আফগানিস্তান) বাজারে বঙ্গদেশের বাঁশ ও রেশম বিক্রি হতে দেখেছিলেন। সেখানে তিনি খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছিলেন যে, চীনের য়ুনান এবং মেকওয়ান প্রদেশ থেকে সেই পণ্য ব্যাকট্রিয়া প্রদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এছাড়া তিনি আরো একটি চমকপ্রদ তথ্য জানতে পেরেছিলেন, সেটা হল যে, সেই সমস্ত পণ্য-সম্ভার ভারতবর্ষের ভেতর থেকে প্রথমে চীনদেশে, এবং তারপরে চীন থেকে আফগানিস্তানে (ব্যাকট্রিয়া) নিয়ে হওয়া হয়েছিল। তখন হিমালয়ের গিরিপথগুলোর ভেতর দিয়ে সিকিম ও চুম্বি উপত্যকা ডিঙিয়ে তিব্বত ও চীনের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্য চলত। ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন যে, খৃষ্টীয় নবম শতাব্দীতে সেই পথ ধরে, উক্ত দুই দেশের মধ্যে পণ্যসম্ভারের আমদানী রপ্তানী করা হত। ৭৮৫-৮০৫ খৃষ্টাব্দে চীনা ভ্রমণকারী ‘কিয়া-টান’ (Kia-Ten)-এর উক্ত পথ ধরেই ভারতে পৌঁছানোর বিবরণ, সেই তথ্যের স্বপক্ষে প্রমাণ দেয়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, অতীতের ব্যাকট্রিয়া, সেখান থেকে আরও সুদূর পশ্চিমে রোমে এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশের বন্দরে নগরে বঙ্গদেশের রেশম, বাঁশ, তেজপাতা ইত্যাদি বিচিত্র পণ্যসম্ভারের জয়যাত্রার মূলে, খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের চীনা সম্রাট ‘সিন-চি-হোয়াংটি’র (Tsin-hwangti) আশ্চর্য একটা কৃতিত্ব রয়েছে। শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার লিখেছিলেন, “He began the great wall across the Gobi desert and prepared the way for direct communication with Bactria and regular Caravan trade between China and Bactria began in 188 B. C.” প্রশ্ন হল যে, হোয়াংটি হঠাৎই গোবি মরুভূমির সেই মহাপ্রাচীর তৈরী করতে গিয়েছিলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেরিপ্লাসে পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে যে, ব্যাকট্রিয়ার সেই পথ তখন, অসংখ্য বর্বর ও দুর্দ্ধর্ষ পার্বত্য জাতির দ্বারা অধ্যুষিত ছিল। তাঁরা বণিকদের পণ্যসম্ভার নিয়ে মন্থরগতিতে চলা উটের ক্যারাভ্যানের ওপরে লোলুপ উল্লাসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁদের সর্বস্ব লুঠ করে নিত। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন যে, একদা পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য চীনের সেই প্রাচীর, চীন ও বাংলার বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির একটি অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।
অতীতে বাংলার বৈদেশিক বাণিজ্য নিম্নলিখিত স্থলপথগুলো দিয়ে চলত -
(ক) পুণ্ড্রবর্দ্ধন থেকে কামরূপ। তারপরে কামরূপ থেকে আসাম ও মণিপুবের উচ্চ পাহাড় ডিঙিয়ে ব্রহ্মদেশের ঘনজঙ্গলে সমাচ্ছন্ন উপত্যকার ভেতর দিয়ে দক্ষিণ চীন পর্যন্ত বাঙালী সার্থবাহের দল পৌঁছে যেতেন। সেই দীর্ঘ পথের ধুলোয় আজও অতীতের স্বনামধন্য বৌদ্ধভিক্ষু ‘য়ুয়ান-চোয়ান’-এর পদরেণু মিশে রয়েছে। স্মরণাতীতকাল থেকেই কামরূপের বস্ত্র, চন্দনকাঠ আর অগরুর খুব খ্যাতি ছিল।
(খ) পুণ্ড্রবর্দ্ধন থেকে আরও পশ্চিমে পাটলিপুত্র। প্রাচীন বৌদ্ধগ্রন্থে পাটলিপুত্রের নাম হল ‘পালিবোথারা’ (মগধ)। পুণ্ড্রবৰ্দ্ধন থেকে বাঙালী ব্যবসায়ীদের সহযাত্রী হয়ে বৌদ্ধ পরিব্রাজক ই-ৎ-সিঙ যে তাম্রলিপ্ত থেকেই (সপ্তম শতাব্দীর সতেরো দশকে) বুদ্ধগয়ায় গিয়েছিলেন - এই বহুল প্রচারিত তথ্যের ভেতরে যে ঐতিহাসিক সত্যিটি স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়ে ওঠে, সেটা হল যে, তখন বণিকদের যাতায়াতের পথ ধরেই বৌদ্ধ পরিব্রাজকেরা দূর দেশ-দেশান্তরে চলে যেতেন।
(গ) তাম্রলিপ্ত থেকে হিমালয় ডিঙিয়ে সিকিম আর চুম্বী উপত্যকা পর্যন্ত আরেকটা বাণিজ্য পথ ছিল - সেকথা কিছু আগেই আলোচনা করা হয়েছে। তখন ওই দুর্গম পাহাড়ী রাস্তা ধরেও বৌদ্ধ পরিব্রাজকেরা মগধে আসতেন। আর পেরিপ্লাস জানাচ্ছে যে - সিল্কের সুতো, রেশমের গুটি আর সিল্কের কাপড় - এই অপূর্ব পণ্যসম্ভার তখন চীন থেকে বাংলার বাণিজ্যকেন্দ্র তাম্রলিপ্ত হয়ে জলপথে সুদূর দক্ষিণ ভারতের বন্দর দামিরিকায় চলে যেত। ‘ত্ববাকত-ই-নাসিরী’ (Tabaqat-i-Nasiri) গ্রন্থে এই পথটির প্রসঙ্গে আরো একটি চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যায়। উক্ত গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, মধ্যযুগে ওই পথ ধরেই হিমালয় থেকে তিব্বত হয়ে বাংলার অভিমুখে হাজার হাজার ঘোড়া নিয়ে আসা হত। তখন ‘কারপাটানা’ কিংবা ‘কারামবাটানের’ (ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন যে, হিমালয়ের পাদদেশে বাংলার সীমানাভুক্ত কোন বড় বাণিজ্যকেন্দ্র) হাটে প্রতিদিন সকালে প্রায় দেড় হাজার হৃষ্টপুষ্ট পাহাড়ী ঘোড়া বিক্রি করা হত। সেই সময়ে মধ্য এশিয়া থেকে চীন ও তিব্বত পেরিয়ে কামরূপের ভেতর দিয়ে সেই সহস্র বলশালী অশ্বের বিচিত্র পণ্যসম্ভার নিয়ে আসা হত। কামরূপ থেকে তিব্বতের ভেতরে যাওয়ার জন্য গিরিপথটির খবরও ত্ববাকত-ই-নাসিরীতে পাওয়া যায়।
(ঘ) এছাড়া তখন গঙ্গে, অর্থাৎ তাম্রলিপ্ত থেকে কলিঙ্গ হয়ে দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত আরেকটি স্থলপথ চালু ছিল।
অতীতে সারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেই বাংলার সুপ্রাচীনকালের সমুদ্রবাণিজ্য তথা অন্তর্বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল তাম্রলিপ্তে আসবার পথ ছিল। এই তথ্যের প্রমাণস্বরূপ হাজারীবাগ জেলার দুধপানি পাহাড়ের গায়ের সেই প্রাচীন শিলালিপির কথা বলা যেতে পারে, যা কালের ব্যবধান এড়িয়ে আজও জ্বলজ্বল করছে। সেই শিলালিপি অনুসারে, সুদূর অতীতের কোন এক সময়ে অযোধ্যা থেকে তিন ভাই তাম্রলিপ্তে এসে কিছুকালের মধ্যেই প্রচুর অর্থ উপার্জন করে পুনরায় নিজেদের দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকেরা সেই লিপিটিকেই ‘উদয়মাল্যার শিলালিপি’ বলেন, এবং তাঁরা অনুমান করেন যে, সেটা খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে উৎকীর্ণ করা হয়েছিল। পাণিনির ‘অষ্ট্যাধায়ী’তে বলা হয়েছে যে, উত্তরাপথ গান্ধার থেকেও একটা বাণিজ্যপথ সুদূর তাম্রলিপ্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ‘মিলিন্দপনহো’র বিবরণ থেকে জানা যায় যে, শুধু ই-ৎ-সিঙ নন, ‘নাগসেন’ নামের আরেক বৌদ্ধসন্ন্যাসীও হিমালয় ডিঙিয়ে উত্তর পশ্চিমের পার্বত্য পথ অনুসরণ করে একজন বণিকের সঙ্গে পাটলিপুত্রে এসেছিলেন। সুদূর অতীতে উত্তর বাংলার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র পুণ্ড্রবর্দ্ধন ও দক্ষিণবঙ্গের আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর তাম্রলিপ্ত হয়ে আসমুদ্র হিমাচলে দেহের শিরা-উপশিবার মত ছড়ানো আরও অসংখ্য পথে যে বাঙালী সার্থবাহের পণ্যসম্ভারে বোঝাই গোরুর গাড়ির লহর চলতো - উপরোক্ত তথ্যগুলো থেকে এখন একথা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে।
অতীতের বঙ্গদেশের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের বন্দর দামিরিকা হয়ে সুদূর রোমেরও যে পরোক্ষ বাণিজ্যিক সম্বন্ধ ছিল - প্লিনি, টলেমি আর পেরিপ্লাসের গ্রন্থ থেকে সেটার আভাস পাওয়া যায়। তখন চীন থেকে যে সিল্কের পণ্যসম্ভার বঙ্গদেশে এসে, আবার তাম্রলিপ্ত থেকে দক্ষিণ ভারতের বন্দরে চলে যেত - সেই অপূর্ব চীনা সিল্ক রোমান সওদাগরদের আকৃষ্ট করেছিল। রোমের বাজারে গাঙ্গেয় জটামাংসীর (Gangetic spikenard) চাহিদা ছিল। সেই সময়ে, এক বাক্স সুগন্ধী ওই দ্রব্যটির জন্য রোমের বণিকেরা ৩০০টি দীনার, অর্থাৎ তিন কোটি স্বর্ণমুদ্রা দাম দিতেন। এছাড়া তেজপাতা, দারুচিনি, সুদৃশ্য রঙীন পাথর, মণিমুক্তা, হীরা, জহরৎ, এবং বিলাসিতার যাবতীয় পণ্যও তখন দক্ষিণভারত থেকে রোমে রপ্তানী করা হত। সেই সময়ে তাম্রলিপ্ত থেকে কোলান্দিয়া নামের পণ্যতরী নিয়মিত দাক্ষিণাত্যে চলাচল করত বলেই অনায়াসে এই সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে যে, তখন বঙ্গদেশের সঙ্গে রোমের নিয়মিত ব্যবসাবাণিজ্য চলত।
(পরিশেষে গাঙ্গেয় জটামাংসী সম্বন্ধে জানিয়ে রাখা যাক। বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, সেটি একটি সুগন্ধী দ্রব্য বিশেষ। গাড়োয়াল থেকে সিকিম পর্যন্ত বিস্তীর্ণ হিমালয়ের উচ্চশৃঙ্গে এই বৃক্ষ জন্মায়। জটামাংসীর মূলের বর্ণ ফিকে কালো, তীব্র সুমিষ্ট গন্ধ, এবং আস্বাদ কটু। ২৮ সের জটামাংসী পিষলে দেড়-ছটাক সুগন্ধী তেল তৈরী করা সম্ভব।)
তথ্যসূত্র:
- ১- Journal of Royal Asiatic Society, New Series, Notes on the early history of Northern India by J. F. Hewitt, Vol. 10. 1888.
- ২- Periplus of Erythraean Sea, Schoff.
- ৩- Commerce and the Navigation of the ancients in Indian ocean, Vol. 2, William Vincent.
- ৪- Invasion of India by Alexander the Great as described by Arrian, Curtius, Diodoros, Plutarch; McCrindle.
- ৫- Ancient India as described by Megasthenes, McCrindle.
- ৬- Trade of India by P. T. SriNivas Iyengar In Historical Quarterly, 1926.
- ৭- Journal of Royal Asiatic Society 1898.
- ৮- History of Bengal, Vol. 1, R. C. Majumdar.
- ৯- প্রাচীন ভারতের পথ পরিচয়, গৌরাঙ্গগোপাল সেনগুপ্ত।
©️রানা চক্রবর্তী©️
0 মন্তব্যসমূহ