ধর্মান্তরের ফলাফল - সুষুপ্ত পাঠক

স্বাভাবিক সময়ে মানুষ ধর্মান্তরিত হয় দুটি কারণে। প্রেম-ভালোবাসা জনিত কারণে, আর্থিক ও সামাজিক লাভের কারণে। অস্বাভাবিক সময়ে যেমন যুদ্ধবিগ্রহের সময় মানুষ অস্ত্রের মুখে ধর্মান্তরিত হয়। অন্য ধর্মকে ভালোবেসে নিজ ধর্ম ত্যাগের ঘটনা রেয়ার। এমন ধর্মান্তর ব্যাতিক্রমই ধরতে হবে।


ধর্মান্তর সহজ কাজ নয়। তাকে তার পরিবার, বন্ধুবান্ধব, কমিউনিটিকে চিরকালের জন্য ত্যাগ করতে হবে। এ রকম ঝুঁকি মানুষ নেয় প্রেমে পড়লে। অথবা নিজের সামাজিক লাভের জন্য। 


পৃথিবীতে ইহুদী ও হিন্দু ধর্ম ধর্মান্তর বিশ্বাস করে না। তারা মনে করে জন্মগতভাবেই ইহুদী ও হিন্দু হতে হবে। অন্য ধর্মের লোক তাদের ধর্মে আসতে চাইলে তারা সেটা পছন্দ করে না। হিন্দুরা তো এককাঠি সরেস! এরা নানা রকম অভিযোগ তুলে হিন্দুদেরই অন্য ধর্মে চলে যাবার রাস্তা তৈরি করে দেয়!


ধর্মান্তর ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্ম তাদের একটি প্রধান কাজ বলে মনে করে। এরা মনে করে পৃথিবীর সব মানুষকে নিজ ধর্মে আনতে হবে। কারণ এরা নরকে যাবে এটি তারা সহ্য করতে পারে না। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে কাফেরদের দ্বিনের পথে আনা।


ইউরোপে রেঁনেসার পর খ্রিস্টান ধর্মের সেই দিনকাল আর নেই। ফলে বিশ্বজুড়ে তাদের ধর্মান্তরিত মিশন আজ আর সে চেহারা নেই। এক্ষেত্রে ইসলাম একমাত্র শিকারী ধর্ম। তাদের মিশনারী সংগঠনগুলো ছাড়াও বিশ্বব্যাপী প্রতিটি মুসলমান মানেই একজন করে ইসলাম ধর্মের দাওয়াতী দুত। অমুসলিমদের তারা জীবনে কোন না কোনভাবে ইসলাম গ্রহণের জন্য প্ররোচনা করে থাকবেই।


ইসলামের নানা রকম ভালো চেহারা দেখিয়েও ধর্মান্তর সহজ কাজ নয়। কারণ মানুষ সহজে নিজের সমাজ ছাড়তে চায় না। বাঙালি মুসলমানদের পূর্ব পুরুষ হিন্দু ও বৌদ্ধ ছিল। তারা মুসলিম শাসনে কী রূপে মুসলমান হয়েছিল ইতিহাসে তার কোন দলিল নেই। নেই বলেই একদল ইতিহাস লিখেছে, ইসলামের উদার ভ্রাতৃত্ববোধ দেথেই সবাই ইসলামের ছায়াতলে চলে এসেছে। এরকম গাঁজাখুরী ইতিহাস কেন কেবল বাংলায় ঘটল তার কোন উত্তর নেই। দিল্লির মত পুরোনো শহর গঞ্জে কেন হিন্দুরা ইসলাম গ্রহণ করেনি তার কোন উত্তর নেই। সম্ভবত পূর্ববঙ্গে জমির লোভে ধর্মান্তর হয়েছিল। এরকম সরকারী নখি পাওয়া যায়। এছাড়া ছিল নানা রকম কর থেকে মুক্তির প্রলোভন। এরকম সামাজিক রাজনৈতিক কারণেই বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করা সহজ হয়েছিল।


বর্তমান পৃথিবী ধর্মান্তরিত মুসলমানদের আমরা যতটা চিনি ততটা ইসলাম ত্যাগকারীদের চিনি না। এর কারণ নওমুসলিমদের আমরা ইসলাম প্রচারের ঘুটি হিসেবে দেখি। নওমুসলিম হুজুর বলতে একটা শ্রেণীই তৈরি করা হয়েছে যারা ওয়াজ করে নিজের ত্যাগ করা ধর্মের অকথ্য সমালোচনা করে বিনোদন প্রদান করবে। মনে করে দেখুন সুপারস্টার অভিনেতা লিওয়ার্দো ডিকাপ্রিয়া যে খ্রিস্টান থেকে বৌদ্ধ হয়েছিলেন সেটা কারোর আর মনে আছে? টাইটানিক মুক্তির পরই নিজের মনের ভেতরে নানা চাপ থেকে মুক্তি পেতে তিনি বৌদ্ধ হয়েছিলেন। ব্যস, তারপর আর কিছু দেখেছেন? শুনেছেন? কিন্তু আমেরিকার কালো মানুষ বিশ্ববিখ্যাত বক্সার ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে যখন ইসলাম গ্রহণ করে নিজের নাম মোহাম্মদ আলী রাখলেন তারপর থেকে কি ঘটেছিল? আলীর প্রধান কাজই হয়েছিল ইসলাম প্রচার করা। নিজের খ্রিস্টান নামকে তিনি বলতেন ওটা একটা দাসের নাম! আলী আসলে এলিজা মোহাম্মদ নামের একজন কট্টর মুসলমানের পাল্লায় পড়ে মগজ ধোলাই হয়েছিলেন। এলিজা মোহাম্মদের মিশন ছিল, আমেরিকার কালোদের উপর বৈষম্যকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে ইসলামের ভ্রাতৃত্বের গল্প দিয়ে মুসলমান বানিয়ে আমেরিকায় ইসলামকে একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো। সেক্ষেত্রে ক্যাসিয়াসের মত বড় নামকে ধর্মান্তর করা ছিল তাদের বড় সফলতা।


এখানেই ধর্মান্তরিত মুসলমানের সঙ্গে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, হিন্দুর ব্যবধান। হ্যাঁ, ইসকন মতে এখন অহিন্দুরাও হিন্দু হতে পারে। কিন্তু হিন্দুদের জ্যাতাভিমান সেসব ধর্মান্তরিত অহিন্দুদের তারা ‘সহি হিন্দু’ মনে করে না।


ভারতের সিদ্ধার্থের কথা আমার খুব মনে পড়ে। ছেলেটি গানবাজনা করত। প্রেমে পড়ল হিজাবী এক মেয়ের। তাকে বিয়ে করতে হলে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে। সিদ্ধার্থ ইসলাম গ্রহণ করলো। বিয়ে করল। তারপর আইএসের হয়ে ভয়ংকর এক খুনি জিহাদী হয়ে গেলো। বুকে হাত দিয়ে একবার একটা সত্য কথা বলেন তো, সিদ্ধার্থ যদি খ্রিস্টান হতো তার পরিণতি এমন হতো? যদি সে বৌদ্ধ হতো, কিংবা ইহুদী?


আমরা সবাই জানি হতো না। ইসলামের একদম শেষ ধাপ পর্যন্ত গেলে আপনাকে জঙ্গি হতে হবে। একজন প্রাক্টিসিং মুসলমান যদি মনে করে আমি ইসলামের সর্বোচ্চ স্তরে চলে যাবো তাহলে তাকে জঙ্গি হতে হবে। নিজের জন্য যতটুকু সুবিধার ততটুকু মানবো, বাকীটাকে বলবো কাঠমোল্লাদের বানানো- এটা হচ্ছে মধ্যপন্থা, যাদেরকে মডারেট বলা হয়। 


কবি মধুসূদন দত্ত খ্রিস্টান না হয়ে মুসলমান হলে তার হাত দিয়ে আর মেঘনাদ বধ কাব্য বের হতো না। তিনি হয়ে উঠতেন ‘কবীর সুমন’!


সমস্যাটা কোথায় দেখেন। সমুন চট্টপাধ্যায় নওমুসলিম হলে হয়ে যান ‘কবীর সুমন’। ‘কবীর সুমন’ সুমন চট্টপাধ্যায়ের লেখা সব গানের বিপরীত এক ক্যারেক্টার। আবার আল মাহমুদ মার্কসবাদী থেকে হয়ে যান জামাত ইসলামী। রাহুল সাংকৃত্যায়ন যদি হিন্দু থেকে বৌদ্ধ না হয়ে মুসলমান হতেন তাহলে তিনি হতেন আরেক সলিমুল্লাহ খান!


শেষ কথা বলি। যাকে ভালোবাসেন তার সব কিছুকে ভালোবাসতে হয়। না হলে কি দেখে তাকে ভালোবাসলেন? তার ধর্ম, সংস্কৃতি, জাতি সব কিছুকে ভালোবাসতে হবে। ধর্ম ভালোবাসায় কোন বাঁধা নয়। যদি আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকা আপনাকে ধর্ম পরিবর্তন করে তার ধর্ম গ্রহণ করতে বলে জানবেন সে আপনাকে ভালোবাসেনি। সে একটা সোয়াব বা পূণ্য লাভের মিশনে বেশি আগ্রহী ছিল।


এই সত্যগুলি বলা নিজের জন্য ঠিক না। নিজের একটি নিরাপদ ইমেজ দাঁড় করা যায় না। সুশীল নাস্তিক মুক্তমনাদের বানানো সহি নাস্তিক-মুক্তমনার খাতা থেকে নাম কাটা যায়! তবে আমি বরাবরই দলছুট। একা। এবং যোদ্ধা। 


 ©সুষুপ্ত পাঠক

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ