৪৪ বছর পর সলিলের পক্ষে আদালতের রায়

৪৪ বছর পর সলিলের পক্ষে আদালতের রায়

মেহেদী হাসান পিয়াস, ০৫ মে, ২০২৩ ০০:০০


একজন চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন সলিল কান্তি চক্রবর্তী। শিক্ষাগত যোগ্যতার কমতি ছিল না। চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে। ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রয়োজনীয় অন্যান্য শর্তও পূরণ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ভর্তি হতে পারেননি। মূলত তাঁকে ভর্তি হতে দেওয়া হয়নি। জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।


সে অভিযোগ যে ভুয়া, আদালতে তা প্রমাণও হয়েছে। এমনকি এক পর্যায়ে উচ্চ আদালত নির্দেশও দিয়েছিলেন তাঁকে ভর্তি করাতে। এর পরও ভর্তি হতে পারেননি সলিল। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে অনার্স-মাস্টার্স করলেও নৈতিক অবস্থান থেকে আইনি লড়াইয়ে ছিলেন। সে লড়াইয়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ও পক্ষে পেয়েছেন অকৃতদার সলিল।


গত বুধবার বিচারপতি মো. নূরুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। বান্দরবান সদরের ষাটোর্ধ্ব সলিল কান্তি চক্রবর্তীকে দুই কোটি টাকা দিতে বলেছেন আপিল বিভাগ। সলিল কান্তির আইনজীবীর ভাষ্য, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের পক্ষে অধ্যক্ষকে এ টাকা পরিশোধ করতে হবে।


আদালতে সলিল কান্তি চক্রবর্তীর পক্ষ ছিলেন আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার।


রায়ের বিষয়ে আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, 

‘জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ১৯৭৮-৭৯ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস কোর্সের ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে সলিল কান্তি চক্রবর্তীকে বাদ দেওয়া হয়। সেখানে ভর্তি হন শফিকুর রহমান নামের একজন। পরে শফিকুর রহমানের শিক্ষা সনদসহ সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্র জাল বলে শনাক্ত হয়। এই জালিয়াতির দায়ে চট্টগ্রামের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তাঁর আট বছরের কারাদণ্ডও হয়।’


ফোনে যোগাযোগ করা হলে সলিল কান্তি চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, 

তিনি অসুস্থ। রায়ের বিষয়টি শুনেছেন। আইনজীবীর সঙ্গে কথা না বলে তিনি রায়ের বিষয়ে কোনো কথা বলবেন না। 


যা ঘটেছিল : বান্দরবান সদরের সারদা চরণ চক্রবর্তীর ছেলে সলিল কান্তি চক্রবর্তী আট ভাই-বোনের মধ্যে পঞ্চম। ১৯৭৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ১৯৭৮-৭৯ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তির আবেদন করেন। ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করেন। ভর্তি হতে যাবেন, ঠিক এ সময় কলেজের ভর্তি বাছাই কমিটি সলিল কান্তির বিরুদ্ধে মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকের নম্বরপত্রসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জালিয়াতির অভিযোগ তোলে। ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ভর্তি প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার সুপারিশও করে তারা।


অভিযোগ অস্বীকার করে সলিল কান্তি ভর্তির চেষ্টা চালিয়ে যান। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে বিশেষ বিবেচনায় ভর্তি নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষের দপ্তরে আবেদন করেন। তাঁর এমন এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সলিল কান্তি চক্রবর্তীকে চিঠি দিয়ে জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে তদন্তাধীন। সংস্থাটি সিদ্ধান্ত জানালে তবেই তাঁর ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।  


১৯৯৪ সালের ২ আগস্ট সে সময়ের দুর্নীতি দমন ব্যুরোর সুপারিশে জালিয়াতির অভিযোগে সালিল কান্তির বিরুদ্ধে বান্দরবান থানায় মামলা করে পুলিশ। মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে এসএসসি ও এইচএসসির নম্বরপত্রসহ অন্যান্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট জাল কাগজপত্র তৈরির অভিযোগ আনা হয় মামলায়। চার বছর ধরে চলে মামলার তদন্ত। এই চার বছরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয় পাঁচবার। ১৯৯৮ সালে মামলার অভিযোগপত্র দেয় অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ওই বছর ১ সেপ্টেম্বর সলিল কান্তি চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত। ২০০০ সালের ২১ আগস্ট এ মামলার রায় হয়। বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা হাকিম শাহ মোকসেদ আলী জালিয়াতির অভিযোগ থেকে সলিল কান্তি চক্রবর্তীকে বেকসুর খালাস দেন। তত দিনে সলিল কান্তির বয়স চল্লিশ।


এ রায়ের পর ২০০১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সলিল কান্তি চক্রবর্তীর ভর্তির সুপারিশ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুই পরিচালক স্বাস্থ্যসচিবকে তিনবার চিঠি দেন। এতে কাজ না হওয়ায় ২০০৩ সালের ২৪ জুন সলিল কান্তি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেন। একের পর এক এমন আবেদনের ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ১৭ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সলিল কান্তির ভর্তির বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে চিঠি দেন। এতেও কাজ না হওয়ায় ওই বছর ২৮ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে আবেদন করেন। এতে ফল না পেয়ে ২০০৫ সালের ১৫ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠান সলিল কান্তি। নোটিশে ১৫ দিনের মধ্যে তাঁর ভর্তির পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়। সাড়া না পেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।


হাইকোর্টের রায় ও পর্যবেক্ষণ : রিটের প্রাথমিক শুনানির পর উচ্চ আদালত ২০০৫ সালের ২৫ জুন সলিল কান্তি চক্রবর্তীর ভর্তি নিয়ে রুল জারি করেন। আর অন্তর্বর্তী আদেশে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের চলতি শিক্ষাবর্ষে (২০০৫-০৬) তাঁকে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি করতে বিবাদীদের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং তাঁর ভর্তির ক্ষেত্রে বিবাদীদের ইচ্ছাকৃত বিলম্বের জন্য তাঁকে কেন আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় রুলে। চূড়ান্ত শুনানির পর ২০০৭ সালের ১ আগস্ট রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে রুল যথাযথ ঘোষণা করার পাশাপাশি ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে তাঁকে ভর্তি করাতে নির্দেশ দেওয়া হয়। হাইকোর্টের রায়ের সময় সলিল কান্তির বয়স ৪৪ বছর।


সলিল কান্তি চক্রবর্তীর এ ঘটনাকে ‘মর্মান্তিক’ উল্লেখ করে হাইকোর্ট রায়ে বলেছেন, ১৯৭৯ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে সলিল কান্তি চক্রবর্তী ভর্তির আবেদনের ১৫ বছর পর ১৯৯৪ সালের ২ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা করা হয়। মামলার বিষয়ে দুর্নীতি দমন ব্যুরোর কথিত সিদ্ধান্ত জানতে ১৫ বছর অপেক্ষা করাতে তাঁকে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপর আদালতের সিদ্ধান্ত জানতে লেগে যায় আরো ছয় বছর।


উচ্চ আদালতের রায়ে আরো বলা হয়েছে, বিবাদীরা সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নেওয়ায় চিকিৎসক হতে চাওয়া সলিল চক্রবর্তী বিপর্যস্ত হয়েছেন। তাঁর জীবন থেকে ২৩টি সোনালি বছর হারিয়ে গেছে। বিচারিক আদালতের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে বিবাদীরা আপিল করেনি। অন্যদিকে সলিল কান্তির বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপও নেয়নি। এ ধরনের নিষ্ক্রিয়তায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে বিবাদীদের নিছক অবহেলা ও স্বেচ্ছাচারিতা সলিল কান্তি চক্রবর্তীর সাংবিধানিক অধিকারকে খর্ব করেছে। 


ওই বছরই হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ওই আবেদনের শুনানির পর হাইকোর্টের রায়টি স্থগিত করা হয়। এরপর লিভ টু আপিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত বুধবার সে আপিলই খারিজ করে রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে মামলার খরচ হিসাবে সলিল কান্তি চক্রবর্তীকে দুই কোটি টাকা দিতে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


সূত্র: কালের কণ্ঠ

==========


৪৪ বছরের লড়াই : সলিল চক্রবর্তীকে ২ কোটি টাকা দেওয়ার নির্দেশ

Dhaka Post Desk, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, ০৫ মে ২০২৩, ০৮:১৬ এএম


৪৪ বছর আগে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চট্টগ্রাম মেডিকেলে কলেজে ভর্তি হতে না পারা বান্দরবানের সলিল কান্তি চক্রবর্তীকে দুই কোটি টাকা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। চট্টগ্রামের মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষকে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।


বুধবার (৩ মে) আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো.নুরুজ্জামান ননীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই আদেশ দেন।


আদালতে সলিলের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।


মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ১৯৭৬ সালে এসএসসি ও ১৯৭৮ সালে এইচএসসি পাসের পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ১৯৭৮-৮৯ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তির জন্য আবেদন করেন সলিল কান্তি। প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করার পর তিনি ওই কোর্সে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হন। কিন্তু সলিল কন্তি চক্রবর্তীর এসএসসি-এইচএসসির নম্বরপত্রসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জাল উল্লেখ করে তাকে ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়ে দেয় মেডিকেল কলেজের বাছাই কমিটি। সেই সঙ্গে ভর্তি প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করার সুপারিশ করা হয়। 


এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে বিশেষ বিবেচনায় ভর্তির জন্য বিভিন্ন সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের দপ্তরে আবেদন করেন সলিল কান্তি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৮ সালে ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সলিল কান্তি চক্রবর্তীকে চিঠি দিয়ে জানায়, তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে তদন্তাধীন। সংস্থাটি সিদ্ধান্ত জানালে তার ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।   


কিন্তু নম্বরপত্রসহ ভুয়া কাগজপত্র তৈরির অভিযোগে ১৯৯৪ সালের ২ আগস্ট সালিল কন্তির বিরুদ্ধে বান্দরবান থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারার অভিযোগ আনা হয়।  মামলায় মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে এসএসসি ও এইচএসসির নম্বরপত্রসহ অন্যান্য শিক্ষা সংশ্লিষ্ট জাল কাগজপত্র তৈরির অভিযোগ করা হয়। পঞ্চম দফায় মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন হওয়ার পর ১৯৯৮ সালে মামলার অভিযোগ পত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ -সিআইডি। ওই বছর ১ সেপ্টেম্বর সলিল কান্তি চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত। 


কিন্তু ২০০০ সালে বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাহ মোকসেদ আলী মামলার অভিযোগ থেকে সলিল কান্তিকে বেকসুর খালাস দিলেও তার ভর্তির বিষয়ে রায়ে কিছু বলা হয়নি। এ রায়ের পর ২০০১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সলিল চক্রবর্তীর ভর্তির সুপারিশ করে স্বাস্থ্য সচিবকে তিনবার চিঠি দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুই পরিচালক।


তাতে কাজ না হওয়ায় ২০০৩ সালের ২৪ জুন মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেন সলিল কান্তি। একের পর এক এমন আবেদনের ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ১৭ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সলিল কান্তির ভর্তির বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে চিঠি দেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব। তারপরও পদক্ষেপ না নেওয়ায় ওই বছর ২৮ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে আবেদন করেন সলিল কান্তি। 


তাতেও কাজ না হওয়ায় ২০০৫ সালের ১৫ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠান সলিল কান্তি। নোটিশে ১৫ দিনের মধ্যে তার ভর্তির পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়। এতে সাড়া না পেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন তিনি। 


রিটের প্রাথমিক শুনানির পর সলিল কান্তির ভর্তি নিয়ে রুল জারি করেন আদালত। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষে তাকে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি করতে বিবাদীদের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং তার ভর্তির ক্ষেত্রে বিবাদীদের ইচ্ছাকৃত বিলম্বের জন্য তাকে কেন আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়। চূড়ান্ত শুনানির পর ২০০৭ সালে রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে রুল যথাযথ ঘোষণা করার পাশাপাশি ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে তাকে ভর্তি করাতে নির্দেশ দেওয়া হয়। 


ওই বছরই হাইকোর্টের এই রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ওই আবেদনের শুনানির পর হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন চেম্বার আদালত। রায় স্থগিত থাকা অবস্থায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত লিভ টু আপিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বুধবার (৩ মে) সে আপিল খারিজ করে রায় দিলেন সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে মামলার খরচ হিসেবে সলিল কান্তি চক্রবর্তীকে দুই কোটি টাকা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। 


সূত্র: ঢাকা পোস্ট

==========

চমেকে ভর্তি হতে ৪৩ বছরের যুদ্ধ শেষ হলো সলিলের

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, আপডেট: ০০৩০ ঘণ্টা, মে ৫, ২০২৩


ঢাকা: বান্দরবান সদরের সারদা চরণ চক্রবর্তীর ছেলে সলিল কান্তি চক্রবর্তী ১৯৭৬ সালে এসএসসি ও ১৯৭৮ সালে এইচএসসি পাশের পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) ১৯৭৮-৮৯ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তির আবেদন করেন। প্রয়োজনীয় সব শর্তপূরণ করার পর তিনি ওই কোর্সে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হন।


কিন্তু মেডিকেল কলেজের বাছাই কমিটি সলিল কান্তি চক্রবর্তীর এসএসসি-এইচএসসির নম্বরপত্রসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জাল উল্লেখ করে তাকে তাকে ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেয়।


সেই থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দৌড়াদৌড়ি শুরু সলিল কান্তির। কিন্তু কোনো প্রতিকার তো পাননি। উল্টো তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর অনুসন্ধানের পর সলিল কান্তির বিরুদ্ধে ১৯৯৪ সালে বান্দরবানে মামলা করে পুলিশ। সেই মামলা থেকে খালাস পেয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ফের যোগাযোগ করে কোনো সাড়া পাননি সলিল কান্তি।


পরে তিনি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। ২০০৭ সালে হাইকোর্ট তাকে ভর্তির নির্দেশ দেন। আর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান রাষ্ট্রপক্ষ।  


বুধবার (০৩ মে) আপিল বিভাগ সেই আপিল খারিজ করে দেন। আর খরচা হিসেবে সলিল কান্তিকে দুই কোটি টাকা দিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষকে নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছেন সলিল কান্তির আইনজীবী।


আদালতে সলিল কান্তির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।


আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, সলিল কান্তির ভর্তির আবেদন বাতিল করে ভর্তি প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সুপারিশ করে বাছাই কমিটি। এরপর সলিল কান্তি চক্রবর্তী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে বিশেষ বিবেচনায় ভর্তির জন্য বিভিন্ন সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষকের দপ্তরে কাছে আবেদন করেন।


এক পর্যায়ে ১৯৮৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সলিল কান্তি চক্রবর্তীকে চিঠি দিয়ে জানায়, তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে তদন্তাধীন। সংস্থাটি সিদ্ধান্ত জানালে তার ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।  


কিন্তু নম্বরপত্রসহ ভুয়া কাগজপত্র তৈরির অভিযোগে ১৯৯৪ সালে বান্দরবান থানায় মামলা করা হয়। মামলায় তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারার অভিযোগ আনা হয়। মেডিকেল কলেজে ভর্তি পেতে এসএসসি ও এইচএসসির নম্বরপত্রসহ অন্যান্য শিক্ষা সংশ্লিষ্ট জাল কাগজপত্র তৈরির অভিযোগ করা হয় মামলায়।


বিচার শেষে ২০০০ সালের ২১ আগস্ট বান্দরবানের অতিরিক্তি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাহ মোকসেদ আলী মামলার অভিযোগ থেকে সলিল কান্তি চক্রবর্তীকে বেকসুর খালাস দেন। তবে তার ভর্তির বিষয়ে কিছু বলেননি রায়ে। এ রায়ের পর ২০০১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সলিল চক্রবর্তীর ভর্তির সুপারিশ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুই পরিচালক স্বাস্থ্য সচিবকে তিনবার চিঠি দেন।


তাতে কাজ না হওয়ায় ২০০৩ সালের ২৪ জুন সলিল কান্তি চক্রবর্তী মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য এক প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেন। একের পর এক এমন আবেদনের ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ১৭ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সালিলের ভর্তির বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে চিঠি দেন। তারপরও পদক্ষেপ না নেওয়ায় ওই বছর ২৮ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে আবেদন করেন সলিল।


তাতেও কাজ না হওয়ায় ২০০৫ সালের ১৫ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিস পাঠান সলিল কান্তি। নোটিশে ১৫ দিনের মধ্যে তার ভর্তির পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়। এতে সাড়া না পেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।


রিটের প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট সলিল কান্তি চক্রবর্তীর ভর্তি নিয়ে ২০০৬ সালের ২৫ জুন রুল জারি করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চলতি শিক্ষাবর্ষে (২০০৫-০৬) তাকে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি করতে বিবাদীদের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং তার ভর্তির ক্ষেত্রে বিবাদীদের ইচ্ছাকৃত বিলম্বের জন্য তাকে কেন আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় রুলে। চূড়ান্ত শুনানির পর ২০০৭ সালে ১ আগস্ট রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে রুল যথাযথ ঘোষণা করার পাশাপাশি তাকে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে ভর্তি করাতে নির্দেশ দেওয়া হয়।


ওই বছরই হাইকোর্টের এই রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ওই আবেদনের শুনানির পর হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন চেম্বার আদালত। রায় স্থগিত থাকা অবস্থায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত লিভ টু আপিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সে আপিল খারিজ করে রায় দিলেন সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে মামলার খরচ হিসেবে হিসেবে সলিল কান্তি চক্রবর্তীকে দুই কোটি টাকা দিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ।


আইনজীবী আরো জানান, কত দিনের মধ্যে অধ্যক্ষের কাছ থেকে এই টাকা আদায় হবে সেটা জানতে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি হাতে পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।


তবে ষাটোর্ধ্ব সলিল কান্তি আপাতত গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।


বাংলাদেশ সময়: ০০২০ ঘণ্টা, মে ০৫, ২০২৩

ইএস/এএটি


সূত্র: বাংলানিউজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ