নিদারাবাদ হত্যা মামলায় ফাঁসির রায় কার্যকর

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিদারাবাদ গ্রামের শশাঙ্ক দেবনাথের পরিবারের সকলকে হত্যা করে কসাই তাজুল। ১৯৮৯ সালে ঘটা এই ঘটনাটি অনেকেই ভুলে গেছেন। ইতিহাসে উল্লেখ থাকার প্রয়োজনে খবরটি এখানে রেখে দেয়া হল।


'কালের কণ্ঠ' পত্রিকায় নিদারাবাদ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত খবর আলাদা পোস্ট হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। ছবির ক্যাপশন থাকলেও মূল ছবিগুলো আর নেই। সার্ভারে যে ফোল্ডারে রাখা হয়েছে, তার নাম s.s.c-prostoti-sonkha


আমরা সবকটি খবর একটি পোস্টে একবারে প্রকাশ করলাম। সংশ্লিষ্ট লিংক উল্লেখ করা হল।


নিদারাবাদ হত্যা মামলায় ফাঁসির রায় কার্যকর


আজও আতঙ্ক তাড়া করে

   ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ০০:০০ | 


আজও আতঙ্ক তাড়া করে


ড্রামের ভেতর থেকে হতভাগ্য শশাঙ্কের পরিবারের সদস্যদের লাশ উদ্ধার করা হয়। ছবি : সংগৃহীত


ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিদারাবাদ গ্রামের শশাঙ্ক দেবনাথের পরিবার ছিল একেবারেই নিরীহ। তিনি মুড়ির মোয়া বিক্রি করতেন। তবে তাঁর ছিল অনেক সম্পত্তি। সেই সম্পত্তির প্রতি পাশের গ্রামের তাজুল ইসলামের দৃষ্টি পড়ে। সে কারণেই প্রথমে অপহরণ করে শশাঙ্ককে হত্যা করে সে। দুই বছর পর তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ ছয়জনকে হত্যা করে ড্রামে চুন মিশিয়ে তাতে লাশ ভরে বিলে ফেলে দেওয়া হয়। খুনিরা সে সময় দুই বছরের শিশুকেও হত্যা করে। দুই যুগেরও বেশি আগের সেই চাঞ্চল্যকর সেই ঘটনা নিয়েই অপরাধনামার আজকের আয়োজন। প্রতিবেদনগুলো লিখেছেন আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি বিশ্বজিৎ পাল বাবু ১৯৮৭ সালে শশাঙ্ক দেবনাথ যেদিন অপহৃত হন, সেদিনই তাঁর স্ত্রী বিরজাবালার ঘরে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। নাম রাখা হয় সুজন দেবনাথ। দুই বছর পর ১৯৮৯ সালে সেই দুর্বৃত্তরাই শশাঙ্ক দেবনাথের স্ত্রী-সন্তানসহ পুরো পরিবারের ছয়জনকে রাতের অন্ধকারে অপহরণ করে নিয়ে যায়। সেই সদস্যদের মধ্যে ছিল সুজন দেবনাথও। তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র দুই বছর। এই শিশুকে হত্যা করতেও হাত কাঁপেনি ঘাতকদের। বরং হত্যার পর ড্রামে ভরে পরিবারের অন্য সবার সঙ্গে তার লাশও চুন দিয়ে ডুবিয়ে রেখেছিল খুনিরা। সেই খুনিদের মধ্যে তাজুল ইসলাম ও বাদশা মিয়ার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এক আসামি এখনো পলাতক। অন্যরা কেউ খালাস পেয়ে এলাকায় আছে। তাদের ভয়ে আজও ওই ঘটনা নিয়ে অনেকেই কথা বলতে ভয় পান। তাঁদের আশঙ্কা, বাড়াবাড়ি করলে তাঁদের অবস্থাও হতে পারে শশাঙ্কের মতো। ১৯৮৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বিল থেকে ছয়জনের লাশ উদ্ধারের পর এই খবর ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামে। হাজার হাজার মানুষ মর্মান্তিক সে ঘটনা জানতে ও লাশ দেখতে ঘটনাস্থলে ভিড় জমায়। আসে খুনের সঙ্গে জড়িতদের একজনও। সে হত্যাকাণ্ডের হোতা তাজুল ইসলামের বোনজামাই হাবিবুর রহমান। সে একা বড় একটি নৌকা নিয়ে লাশ দেখতে এলে এলাকাবাসী তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কথাবার্তায় সন্দেহ হলে তাকে পুলিশে দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী কেউ মামলার সাক্ষী ছিল না। প্রথম গ্রেপ্তার হওয়া হাবিবুর রহমানের দেওয়া স্বীকারোক্তি মতেই পুলিশ একে একে হত্যাকারীদের আটক করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আসামি করা হয় তাজুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, এনু মিয়া, ফিরোজ মিয়া, ফিরোজ মিয়া (২), হাবিব মিয়া, আবুল হোসেন, জজ মিয়া, বাদশা মিয়া, মো. কাজল, ফারুক মিয়া, আবুল কাশেমকে। এ ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন সদস্য (মেম্বার) মো. ধন মিয়া চৌধুরী বাদী হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানায় মামলা করেন। পুলিশ এ ঘটনায় ৩৮ জনকে দায়ী করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয়। ১৯৯০ সালের জুন মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জজ আদালত এক রায়ে ৯ জনের ফাঁসি, ২৭ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও দুজনকে বেকসুর খালাস দেন। পরে উচ্চ আদালত খুনি তাজুল ইসলাম, বাদশা মিয়ার ফাঁসি ও আটজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ বহাল রাখেন। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে আবুল হোসেন নামে একজন এখনো পলাতক। তাজুল ইসলাম ও বাদশা মিয়ার ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে।


https://www.kalerkantho.com/print-edition/s.s.c-prostoti-sonkha/2010/09/18/88643


======

আদালতে শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন বিরজাবালা

   ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ০০:০০ | 


শশাঙ্ক দেবনাথ অপহরণ হওয়ার দিন বিকেলে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন বিরজাবালা। তখন তিনি অসুস্থ। এ অবস্থায় শশাঙ্ক দেবনাথ বাড়ি ফিরে না আসায় তিনি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। পরিবারের এমন কেউ নেই যে থানাপুলিশ পর্যন্ত যাবে। শ ম হামিদুল আলম নামে স্থানীয় এক সাংবাদিক ঘটনাটি জানার পর থানাপুলিশের শরণাপন্ন হন। হামিদুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'শশাঙ্ককে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে_থানার ওসিকে এমন কথা বলার পর তিনি চটে যান। বলেন, এসব নিয়ে আপনারা মাথা ঘামাবেন না। যা ইচ্ছা তা লিখে দেন।' পরবর্তী সময়ে 'স্বামীর সন্ধান চান বিরজা'_এ ধরনের শিরোনামে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক প্রতিবেদন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। এরপর বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে চিঠি পাঠানো হলে তদন্ত শুরু হয়। এ ঘটনায় তাজুলসহ দুজনকে আটক করে পুলিশ। তাদের আটকের পর থেকেই বিরজার পরিবারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ অবস্থায় বিরাজবালা কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। তখন আদালতে নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। আসামিদের জামিনের বিরোধিতা করে বিরজাবালা তখন বলেছিলেন, 'আমরা নিরীহ। অন্যদিকে আসামিরা ধূর্ত প্রকৃতির। ছাড়া পেলে ওরা আমাদের প্রাণে মেরে ফেলতে পারে।' শেষ পর্যন্ত বিরজাবালার কথা কেউ শোনেনি। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে আসামিরা বেরিয়ে যায়। এরপর সেই আসামিরাই তাদের অপহরণ করে হত্যা করে ড্রামে ভরে বিলের পানিতে ফেলে রাখে। বিরজাবালার আশঙ্কাই সত্য হয়।

======


'মামলা চালাতে গিয়ে নানা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছি'

   ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ০০:০০ | 


'মামলা চালাতে গিয়ে নানা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছি'

ধন মিয়া


শশাঙ্কের পরিবারের এক মেয়ে ছাড়া আর সবাইকে অপহরণ করার পর থানায় কেউ মামলা করতে চায়নি। এমনকি তাঁর মেয়ে সুনীতি দেবনাথও মামলা করার সাহস করেনি। এ অবস্থায় এগিয়ে আসেন তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) মেম্বার ধন মিয়া চৌধুরী। মামলা করার কয়েক দিন পরই একটি বিল থেকে তাঁদের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়। মামলার বাদী হতে গিয়ে পরবর্তী সময়ে ধন মিয়া চৌধুরীকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। তাঁর পরিবার থেকেছে হুমকির মুখে। শশাঙ্কের মতো তাঁর জীবনও কেড়ে নেয় কি না এই ভয় তাকে কুরে কুরে খেত সারাক্ষণ। তাঁর পরিবারের সদস্যরাও থাকতেন আতঙ্কে। মামলা করতে গিয়ে পুলিশের কাছ থেকেও খারাপ আচরণ পেয়েছেন। মামলার বাদী ধন মিয়া চৌধুরী ওই সময়ের কথা তুলে ধরেন কালের কণ্ঠের কাছে। তিনি জানান, বেঁচে থাকা শশাঙ্কের মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। পরে গ্রামবাসীর সিদ্ধান্তে তিনি মামলা করেন। মামলা চালাতে গিয়ে নানাভাবে তিনি লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। প্রতিনিয়তই হত্যার হুমকির মুখে ছিলেন তিনি। ধন মিয়া চৌধুরী বলেন, 'শশাঙ্ক দেবনাথের পরিবারের সবাই অপহরণ হওয়ার আশঙ্কায় চেয়ারম্যানের দেওয়া লিখিত অভিযোগ দিতে দফাদারকে সঙ্গে নিয়ে থানায় যাই। তৎকালীন ওসি আমাদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন।' তিনি জানান, ওই লোকজন হারিয়ে গেছে উল্লেখ করে লিখিত দিলে তা রাখা হবে। অপহরণের মামলা নেওয়া হবে না। কিন্তু পরদিনই ওসি বদলি হয়ে যান। আসেন নতুন ওসি। তাঁর কাছে গিয়ে জানালে তিনি অপহরণের অভিযোগটি গ্রহণ করেন। তিনি আরো বলেন, 'লাশ উদ্ধারের পর হত্যা মামলায় বাদী হলেও সত্য বলার সাহস পেতাম না। কখনো কখনো ভয়ে খুনিদের সহযোগীদের কথামতো সাক্ষী দিতাম। প্রতিনিয়তই খুনিদের লোকজন আমাকে ভয়ভীতি দেখাত। মেরে ফেলার হুমকি দিত। একবার গম আত্মসাতের মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাকে হয়রানি করা হয়। খালি কাগজে, স্ট্যাম্পে আমার কাছ থেকে কত স্বাক্ষর যে নেওয়া হয়েছে, তার হিসাব নেই। নিজে খুব একটা লেখাপড়া জানতাম না বলে এ নিয়ে বেশি বলারও সুযোগ পেতাম না।' ধন মিয়া চৌধুরী বলেন, 'ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে হওয়া রায়ের দিন সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমার মতো পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ ছিল রায়ের অপেক্ষায়। ঢাকায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ার রায়টি পত্রিকার মাধ্যমে জানি। মনে হচ্ছিল যেন নতুন জীবন পেলাম।' ধন মিয়া চৌধুরীর স্ত্রী বলেন, 'এই একটি হত্যাকাণ্ড আমাদের পরিবারকেও অগোছাল করে দেয়। প্রতিনিয়তই স্বামী, সন্তানদের জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকতাম।'


https://www.kalerkantho.com/print-edition/s.s.c-prostoti-sonkha/2010/09/18/88645

=======

যে কারণে হত্যাযজ্ঞ

   ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ০০:০০ | 


নিদারাবাদ গ্রামের শশাঙ্ক দেবনাথরা ছিলেন একবারে নিরীহ। শশাঙ্ক দেবনাথ মুড়ির মোয়া বিক্রি করে সংসার চালাতেন। তবে তাঁদের ছিল অনেক সম্পত্তি। আর এ সম্পত্তির লোভেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় এ পরিবারটিকে। এলাকাবাসী জানায়, এ খুনের পরিকল্পনাটা ছিল দীর্ঘদিনের। পার্শ্ববর্তী পাঁচগাও গ্রামের তাজুল ইসলাম সম্পত্তি গ্রাস করতেই সম্পর্ক গড়ে তোলে শশাঙ্ক পরিবারের সঙ্গে। একপর্যায়ে শশাঙ্কের স্ত্রী বিরজাবালা তাজুল ইসলামকে ধর্মবাবা বলে ডাকতে শুরু করেন। এভাবে সম্পত্তির অনেক খুঁটিনাটি জেনে যায় তাজুল ইসলাম। ভুয়া দলিল তৈরি করে তাজুল সম্পত্তি আয়ত্তে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরিকল্পনামাফিক অপহরণের পর হত্যা করে শশাঙ্ককে। একপর্যায়ে পুরো পরিবারটিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, যাত্রাপালাকে কেন্দ্র করে সম্পত্তির দিকে নজর আসে তাজুল ইসলামের। তাঁরা জানান, সেই সময় অন্য এলাকায় এক প্রভাবশালীর মাধ্যমে যাত্রাপালা আনা হলে গ্রামবাসী বিরোধিতা করে। যাত্রার দলটিকে রাখার ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে ওই প্রভাবশালী শশাঙ্ক দেবনাথের শরণাপন্ন হন। শশাঙ্ক এতে রাজি না হলে তিনি চটে গিয়ে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। ওই প্রভাবশালী তাঁরই আত্মীয় তাজুল ইসলামকে বিষয়টি জানিয়ে শশাঙ্ক দেবনাথকে ভিটেমাটি ছাড়া করার পরিকল্পনা নেন। শশাঙ্ক দেবনাথকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় তাজুল ইসলাম। এরপর কয়েক দিন তাঁর সন্ধান না পেলে বিষয়টি থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়। কিন্তু থানার ওসি তা আমলে নেননি। বরং মিথ্যা রটনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করতে আসা লোকজনকে তাড়িয়ে দেয়। হামিদুল আলম ও ধন মিয়া চৌধুরী অভিযোগ করেন, শুরু থেকে পুলিশ এ বিষয়ে তৎপর হলে হয়তো শশাঙ্ক দেবনাথের এ পরিণতি হতো না। পুলিশের গাফিলতির কারণে শেষ পর্যন্ত শশাঙ্ক দেবনাথের লাশটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁরা জানান, হরষপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় শশাঙ্ক দেবনাথের লাশ ফেলে রাখা হয়েছে বলে লোক মারফত তাঁরা খবর পান। কিন্তু পুলিশের সহযোগিতা না থাকায় লাশটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। শশাঙ্ককে হত্যার কথা বলা হলে ওসি গ্রামের লোকজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। পরে অবশ্য ওই ওসির অপরাধ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় সাজা প্রদান করা হয়।


https://www.kalerkantho.com/print-edition/s.s.c-prostoti-sonkha/2010/09/18/88650

=======

যেভাবে ধরা পড়ে তাজুল

   ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ০০:০০ | 


যেভাবে ধরা পড়ে তাজুল

সেই তাজুল ইসলাম


নিদারাবাদ গ্রামের শশাঙ্ক দেবনাথের পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হোতা তাজুল ইসলাম। হত্যাকাণ্ডের পর লাশ উদ্ধার হলে সে নিজেকে বাঁচানোর জন্য তাবলিগ জামাতে চলে যায়। বিভিন্ন মসজিদ ঘুরে বেড়ায়। এর মধ্যে ফাঁসির আদেশও হয়ে যায়। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য খুঁজতে থাকে পুলিশ। অবশেষে গোয়েন্দা সূত্রের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, তাজুল ইসলাম ঢাকার কাকরাইল মসজিদে অবস্থান করছে। সেখান থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। পরবর্তী সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। এখনো এলাকার লোকজন তাজুল ইসলামের নাম শুনলে ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।


https://www.kalerkantho.com/print-edition/s.s.c-prostoti-sonkha/2010/09/18/88649

========


'সম্পত্তির জন্য মানুষ এমন পিশাচ হতে পারে'

   ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ০০:০০ | 



'সম্পত্তির জন্য মানুষ এমন পিশাচ হতে পারে'

এখানেই ছিল শশাঙ্কের ঘর।


১৯৮৭ সালের ১৬ অক্টোবর। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার (বর্তমান বিজয়নগর উপজেলা) নিদারাবাদ গ্রাম। কুয়াচ্ছন্ন ভোর। শশাঙ্ক দেবনাথকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় পূর্ব পরিচিত তাজুল ইসলাম। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে গুড় নিয়ে ফিরে আসার কথা বলে বের হন মুড়ির মোয়া বিক্রেতা শশাঙ্ক দেবনাথ। এরপর কয়েক দিন চলে গেলেও তিনি আর ফিরে আসেননি। তাঁর স্ত্রী বিরজাবালা দেবনাথ তাঁর আত্মীয়স্বজনসহ অনেকের বাড়িতে খোঁজ নিয়েও কোনো সন্ধান পাননি। এরপর তিনি তাজুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা করেন। এরই মধ্যে শশাঙ্ক দেবনাথকে অপহরণের পর মেরে ফেলার বিষয়টি স্পষ্ট হতে থাকে। মামলায় সাজা হয়ে যেতে পারে_এমন শঙ্কায় ঘৃণ্যতম পরিকল্পনা নেয় তাজুল ইসলামরা। তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি দুই বছরের শিশুও। ১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাতে ৩০ থেকে ৪০ দুর্বৃত্ত হামলা চালায় শশাঙ্কের পরিবারের ওপর। তারা অপহরণ করে নিয়ে যায় শশাঙ্কের স্ত্রী বিরজাবালা (৪৫), মেয়ে নিয়তি বালা (১৭), প্রণতি বালা (১০), ছেলে সুভাস দেবনাথ (১৪), সুপ্রসন্ন দেবনাথ সুমন ও সুজন দেবনাথকে (২)। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামতে, রাতে শশাঙ্কের পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে ছিলেন। জানালার লোহার রড ভেঙে ঘর ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাঁদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলে। বাঁচার জন্য তাঁরা গগনবিদারী চিৎকার শুরু করেন। তাঁদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলেও সংঘবদ্ধ দলের সামনে দাঁড়াতে সাহস পায়নি। গ্রামবাসীর সামনে দিয়েই অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁদের। অপহরণের ঘটনার ১০ দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর অপহৃত ছয়জনের লাশ মেলে তাঁদের বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে ধুপাজুরি বিলে। বিলে ভেসে ওঠা দুটি ড্রাম থেকে তাঁদের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি লাশই ছিল কয়েক টুকরো। লাশে দ্রুত পচন ধরায় ঘাতকরা ড্রামের ভেতর চুন দিয়ে রাখে। শ্বশুরবাড়িতে থাকায় বেঁচে যান শশাঙ্কের আরেক মেয়ে সুনীতি। নৌকায় করে ধুপাজুরি বিল দিয়ে প্রতিদিনই বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা ছিল ওই গ্রামের শিক্ষক আবুল মোবারকের। কিছু উড়ো কথা তাঁর কানে আসছিল। সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে তিনি নৌকার গতিপথটা একটু ঘুরিয়ে নেন। হঠাৎ নৌকার তলদেশে কী একটা আটকে যাওয়ার শব্দ হয়। আবারও মাঝির বৈঠায় খটখট শব্দে সবারই একটু সন্দেহ হয়। খোঁচাখুঁচি করতেই ভেসে ওঠে ড্রাম। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খবর দেওয়া হয়। ড্রাম খুলতেই স্তব্ধ সবাই। এটিতে তিনজনের লাশ। সাধারণ ধারণা থেকেই আরেক ড্রামের সন্ধান চালানো হয়। মিলেও যায়। আরেকটি ড্রামেও টুকরো টুকরো করে রাখা আরো তিনজনের লাশ! গ্রামবাসী রাতভর পাহারা দিয়ে রাখে ড্রাম। পরদিন পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। আবুল মোবারক বলেন, 'প্রথমে ড্রামের মুখ খুলতেই তৈলাক্ত কিছু বের হতে থাকে। আমরা তখনো ধারণা করতে পারিনি এমন একটি লোমহর্ষক ঘটনার চিত্র দেখতে পাব। লাশ দেখে আমরা নিশ্চিত হই, এটা সম্পত্তিলোভী নরপশুদের কাণ্ড। আজও এসব কথা মনে হলে কূল-কিনারা পাই না। সম্পত্তির জন্য মানুষ এমন পিশাচ হতে পারে, তা ভাবতেও অবাক লাগে।'


https://www.kalerkantho.com/print-edition/s.s.c-prostoti-sonkha/2010/09/18/88648

====

সমাধির জায়গা দখলের পাঁয়তারা!

   ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ০০:০০ | 


সমাধির জায়গা দখলের পাঁয়তারা!

নিহতদের স্মরণে গড়ে তোলা সমাধি।


১৯৮৯ সালে কুচক্রীরা শশাঙ্ক দেবনাথের পুরো পরিবারকে হত্যার পর এলাকার মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। চোখের পানি ঝরে তাদের। এর মধ্যেই এলাকার লোকজন উদ্যোগ নেয় শশাঙ্ক দেবনাথের পরিবারের স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখার জন্য কিছু করার। ঘটনার কিছুদিন পরই পাশের বাড়ির চিত্তরঞ্জনসহ আরো কয়েকজন এ বিষয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তাঁর জমিতেই সমাধি করা হবে। আরো সিদ্ধান্ত হয়, ইট-বালুর টাকা জোগাড় করা হবে শশাঙ্কের লাগানো গাছ বিক্রির টাকায়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গাছ বিক্রি করা হয়। কিন্তু সেই টাকায় সাতটি সমাধি করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ সময় এগিয়ে আসেন একই গ্রামের জাদুমোহন সরকার ও হামিদুল আলম। তাঁরা আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। আর এভাবেই সাতটি সমাধি গড়ে ওঠে। সমাধিগুলো দেখে এখনো এলাকার মানুষের স্মৃতিতে ভাসে ভয়াল সেই হত্যাকাণ্ডের কথা। এ সমাধিগুলো এখন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। লতাগুল্ম দখল করছে তা। শুধু তাই নয়, সমাধির জায়গাটি দখল করারও পাঁয়তারা চলছে। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কিছু বলা যায় না। গ্রামবাসী দখলদারদের হুমকিতে এখন ভীত। সরেজমিনে দেখা যায়, নিহতদের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিস্তম্ভগুলো অযত্ন-অবহেলার শিকার। এগুলোর চারপাশ লতাগুল্মে ভরা। লোকজন স্মৃতিস্তম্ভগুলোর ওপরই বিভিন্ন জিনিস শুকাতে দিচ্ছে। এলাকাবাসী জানিয়েছে, স্মৃতির জন্য রাখা পুরো জায়গা দখলের চেষ্টা চলছে। এলাকাবাসী জানায়, শশাঙ্ক দেবনাথের জায়গায় থাকা গাছ বিক্রি করে ওই সমাধিগুলো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে আর্থিক সহযোগিতা করেন জাদুমোহন সরকার ও হামিদুল আলম। জানা গেছে, শশাঙ্ক দেবনাথের মেয়ে স্মৃতি হিসেবে ১৫ শতক জমি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে লিখে দেন। আর এখানেই গড়ে ওঠে ওই স্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতিস্তম্ভের আশপাশের জায়গাটুকু দখলের চেষ্টা করছে ময়দর আলী ও আজগর আলী নামে এলাকার দুই প্রভাবশালী। তাঁরা ইতিমধ্যেই ১৫ শতক ভূমির কিছু অংশ বেড়া দিয়ে দখল করে নিয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, দখলদাররা প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁরা কিছুর বলার সাহস পাচ্ছেন না। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের কাছে এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন তাঁরা।


https://www.kalerkantho.com/print-edition/s.s.c-prostoti-sonkha/2010/09/18/88647

======


শিশুরা কথা না শুনলে বলা হতো 'তাজুল আসছে'

   ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ০০:০০ | 

শিশুরা কথা না শুনলে বলা হতো 'তাজুল আসছে'

চিত্তরঞ্জন সরকার, হুমায়ুন কবির, হামিদুল আলম



ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার হরষপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাছেই নিদারাবাদ গ্রাম। গ্রামে ঢুকতেই বাঁ পাশে চোখে পড়বে সাতটি সমাধি। ঝোপঝাড়ে ঘেরা। ১৯৯২ সালে স্থানীয় কয়েকজনের পৃষ্ঠপোষকতায় শশাঙ্ক দেবনাথের পরিবারের স্মৃতি রক্ষায় এ সমাধি গড়ে তোলা হয়। তবে শশাঙ্কের সেই বসতভিটাটি এখন আর নেই। গ্রামের মুরবি্ব চান মোহন সরকার (৭৫) বলেন, প্রায় দুই যুগ পরও এ ঘটনার কথা মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, 'এ ঘটনার কয়েক বছর পর পর্যন্ত সন্ধ্যার আগেই লোকজন ঘরে চলে যেত। আমাদের গ্রামে কেউ বেড়াতে আসতে চাইত না।' বিরজাবালাদের জায়গাটি কিনেছেন আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, 'আগে সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে ভয় লাগত। এখন থাকতে থাকতে কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তবু মাঝেমধ্যে ভয়ে আঁতকে ওঠি।' তিনি জানান, শশাঙ্ক দেবনাথের বসতভিটায় এখন কৃষিকাজ করছেন। সমাধির পাশের সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় কথা হয় কয়েকজন স্কুলছাত্রের সঙ্গে। তাদেরই একজন মাইনুল ইসলাম জানায়, ছোটবেলায় মা-বাবার কথা না শুনলে বলা হতো তাজুল আসছে। তাজুলের ভয়ে তারা মা-বাবার সব কথাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করত। স্কুলছাত্র ইমতিয়াজ, নাসির ও জসিম জানায়, 'আমরা গল্পের মতো করে এ কথা শুনেছি। এমন ঘটনা যেন পৃথিবীর আর কোথাও না ঘটে।' লাশ ভেসে ওঠার খবরে পার্শ্ববর্তী মেরাশানী গ্রাম থেকে দেখতে এসেছিলেন আরব আলী। তিনি বলেন, 'হাজার হাজার মানুষের ভিড় ছিল। কৌতূহলবশত লাশ দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু লাশের কাছাকাছি এসে আমি অস্বস্তিবোধ করি। লাশ না দেখেই বাড়ি ফিরে যাই। আজও সে কথা মনে হলে ভয় লাগে।' প্রায় দুই দশক আগের এ ঘটনা অনেকেই স্মৃতিচারণা করতে পারছিলেন না। আবার অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে চান না। আসামিরা সাজা খেটে বের হয়ে যাওয়ায় গ্রামবাসীর মধ্যে আবারও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সিক্স মার্ডার মামলার ২ নম্বর সাক্ষী চিত্তরঞ্জন সরকার। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি অনেকটা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, 'শশাঙ্ক দেবনাথের পরিবারকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকার শুনে আমরা বের হই। কিন্তু অপহরণকারীদের ভয়ে আমরা এগোতে পারিনি। মামলার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বহু লাঞ্ছনার শিকার হই।' সাংবাদিক শ ম হামিদুল আলম বলেন, 'সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে হুমকির সম্মুখীন হই। একটা সময় এলাকায় থাকাই দুরূহ হয়ে পড়েছিল। অপরাধীচক্রটি খুবই শক্তিশালী। এখনো কিছু একটা করে ফেলতে পারে তারা।' হরষপুুর গ্রামের মো. হুমায়ুন কবির (মাস্টার) বলেন, 'ঘটনার কোনো সাক্ষী ছিল না। আসামিদের সাক্ষ্যতেই সাজা হয়। সাক্ষী থাকলে হয়তো তাদের আরো কঠোর সাজা হতো। ওই হত্যাকাণ্ডের কথা ভেবে আজও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হই।' হত্যাকাণ্ডের শিকার সুভাষের বন্ধু মো. শরীফ উদ্দিন। তিনি বলেন, 'অপহরণের ঘটনার দিন দুপুরেও বন্ধু সুভাষের সঙ্গে কথা হয়। সুভাষ কোনো দিন এসব বিষয়ে (জমি নিয়ে তাজুল ইসলামের সঙ্গে সমস্যার কথা) কিছু বলেনি। ভাবতে পারিনি এমন নৃশংসভাবে একটি পরিবারকে শেষ করে দেওয়া হবে।' বিরজাবালাদের পাশের বাড়ির সুকুমারী সরকার বলেন, 'আমি তখন ছোট। লাশ ভেসে ওঠার খবর পাওয়ার পর মনে ভয় ঢোকে। আজও বিষয়টি আমাদের কষ্ট দেয়।' তিনি জানান, মাঝেমধ্যে সমাধিস্থল দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসে।


https://www.kalerkantho.com/print-edition/s.s.c-prostoti-sonkha/2010/09/18/88646

=====

আরো পড়ুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ