– রানা চক্রবর্তী
লালন শাহের জীবনেতিহাস এবং তাঁর মৃত্যুর পরে বাংলায় লালন-চর্চার ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখতে পাওয়া যায় যে, সমকাল ও উত্তরকাল—এই উভয় সময়েই তাঁকে নিয়ে বাঙালি সমাজে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—এই দুই ধরণের সামাজিক প্রতিক্রিয়াই প্রবল হয়েছিল। অর্থাৎ—তিনি তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে, উভয় সময়েই যুগপৎ বন্দিত ও নিন্দিত—উভয়ই হয়েছিলেন। তবে লৌকিক বাংলার এই অসাধারণ মনীষী-ব্যক্তিত্ব তাঁর সমকালে সুধীসমাজের মনোযোগ ও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করতেও সক্ষম হয়েছিলেন। বস্তুতঃ, এসময়ে তাঁর প্রতি কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির একাধিক সদস্যের সানুরাগ ও কৌতূহল তাঁর পরিচয়ের ভূগোলকে আরো প্রসারিত করেছিল; এবং এরফলে লালনের মৃত্যুর পরে তাঁর সম্পর্কে সাধারণ মানুষের আগ্রহ-অনুরাগ ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে অন্যদিকে অবশ্য লালনের জীবদ্দশাতেই বাংলাতে তাঁর বিরুদ্ধে যে প্রবল প্রতিক্রিয়ারও সূচনা ঘটেছিল, ইতিহাসে একথারও সাক্ষ্য পাওয়া যায়। আর ইতিহাস থেকে বাংলায় বাউল বা লালন-বিরোধী আন্দোলনের তথ্য-খতিয়ান সংগ্রহ করলেই এই প্রতিক্রিয়ার যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করা সম্ভব হয়।
বাংলায় বাউল সম্প্রদায়ের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, নিজের জন্মলগ্ন থেকেই এই সম্প্রদায়কে অবজ্ঞা-নিন্দা-নিগ্রহ-বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। একথার উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে, মধ্যযুগের রচনা—‘চৈতন্যচরিতামৃত’ কিংবা ‘রাগায়িকা পদ’—পড়লেই একথার ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বাউল সম্প্রদায়ের প্রতি তখনকার মানুষের অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা কতটা তীব্র ছিল। বস্তুতঃ শাস্ত্রাচারী হিন্দু আর শরীয়তপন্থী মুসলমান—এই উভয় সম্প্রদায়ের কাছ থেকেই বাউলরা তখন অসহিষ্ণুঃ আচরণ ও অবিচার ছাড়া অন্য কিছুই পাননি। এরপরে খৃষ্টীয় ঊনিশ শতকে বাউল-মতবাদ বাংলায় যেমন নিজের উৎকর্ষতার শিখর স্পর্শ করেছিল, ঠিক তেমনি আবার এসময় থেকেই পাশাপাশিভাবে এর অবক্ষয়ও আরম্ভ হয়েছিল। আর ক্রমে ওহাবী, ফারায়জী, আহলে হাদীস প্রভৃতি ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের ফলে বাংলায় এঁদের প্রতি অত্যাচার ও নিগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এখানে বলাই বাহুল্য যে, এসবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার বাউল সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব তখন অনেকাংশ বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। বিশেষতঃ হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮০-১৮৪৯), তিতুমীর (১৭৮২-১৮৩১), কারামত আলী জৌনপুরী (১৮০০-১৮৭৩), দুদু মিয়া (১৮১৯-১৮৬২), মুনশী মেহেরুল্লাহ (১৮৬১-১৯০৭), সৈয়দ আবদুল কুদ্দুস রুমী (১৮৬৭-১৯২৩) প্রমুখ ধর্ম ও সমাজ-সংস্কারকের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় খৃষ্টীয় ঊনবিংশ-বিংশ শতকের বাংলায় বাউল মতের প্রভাব ও প্রসার খর্ব ও ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। এমনকি আজও অনেকক্ষেত্রেই বাংলার বাউলদের প্রতি মুসলমান আলেম সমাজের একটি বিদ্বেষপ্রসূত মনোভাবের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।
উপরিল্লিখিত ব্যক্তিদের মধ্যে ঊনিশ শতকের বাংলার বাউল বা নাড়ার ফকিরদের সম্পর্কে মুন্সী মেহেরুল্লাহর ধারণা ছিল—
“বানাইল পশু তারা বহুতর নরে।” (মেহেরুল ইসলাম)
এমনকি মুসলমান সমাজের এই সংস্কার-আন্দোলনের প্রভাবে মীর মশাররফ হোসেনের মত ব্যক্তিও তখন বাংলার বাউলদের সম্পর্কে অক্লেশে বলেছিলেন—
“এরা আসল সয়তান, কাফের, বেঈমান
তা কি তোমরা জাননা।”
(সঙ্গীত লহরী)
অন্যদিকে কবি জোনাব আলিও তখন প্রচণ্ড আক্রোশে বাউলদের বিরুদ্ধে সরাসরিভাবেই বলেছিলেন
—“লাঠি মার মাথে দাগাবাজ ফকিরের।”
এছাড়া বাংলার বাউল-ফকিরদের বিরুদ্ধে মুসলমানরা তখন নানা বই রচনা করেছিলেন, এবং একইসাথে তৎকালীন বাংলার মুসলিম সমাজের মাথারা তাঁদের বিরুদ্ধে নানা বিধান ও ফতোয়া জারি করেছিলেন। (লালন স্মারকগ্রন্থ, আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত, ঢাকা, চৈত্র, ১৩৮০ বঙ্গাব্দ, পৃ: ১০৫-২৬)
তবে বাংলায় লালন-বিরোধী এই আন্দোলনের সূচনা হঠাৎ করেই ঊনিশ শতক থেকে শুরু হয়ে যায়নি। বস্তুতঃ প্রচলিত শাস্ত্রধর্মের বিরোধী ও মানবমিলনের প্রয়াসী লালনের জীবদ্দশাতেই বাংলায় লালন-বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল। তাঁর জীবনেতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, তাঁর মতবাদ ও সাধনা তখন বাংলার হিন্দু ও মুসলমান—এই উভয় সম্প্রদায়েরই শাস্ত্রবাদী ধর্মগুরু ও রক্ষণশীল সমাজপতিদের দ্বারা বারংবার আক্রান্ত হয়েছিল, এবং তিনি তাঁদের হাতে ক্রমাগত লাঞ্ছিত, অপমানিত ও সমালোচিত হয়েছিলেন। কিন্তু এসব সত্ত্বেও লালন শাহ বরাবরই ধীর, স্থির ও নিজ লক্ষ্যগামী থেকে গিয়েছিলেন বলে কোনো অন্তরায় ও প্রতিবন্ধকতাই তাঁকে নিজের মত প্রচার করবার বিষয়ে নিরুৎসাহিত বা নিরুদ্ধ করতে পারেনি। বরং নিজের জীবদ্দশাতে সব বিরোধিতাকে তুচ্ছ করেই তিনি নিজস্ব পদ্ধতিতে সত্যাভিমুখে পরম প্রত্যাশিত মনের মানুষকে পাওয়ার আশায় অগ্রসর হয়েছিলেন। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, ফকির লালন শাহ গূঢ়-গুহ্য দেহবাদী সাধনার তত্ত্বজ্ঞ সাধক ছিলেন বলে এসব দুঃখ-আঘাত-বেদনার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ তাঁর গানে কখনোই প্রতিফলিত হয়নি। তবে তখন তাঁর সঙ্গে যে কি কি ঘটেছিল, এসবের প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় অবশ্যই যায়। যেমন—হরিনাথ মজুমদার বা কাঙাল হরিনাথের ১২৭৯ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসের প্রথম সপ্তাহের বা ১৮৭২ সালের আগস্ট মাসের সাপ্তাহিক ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’য় ‘জাতি’ শিরোনামের রচনায় লালন ফকির সম্বন্ধে প্রসঙ্গক্রমে যে আলোকপাত করা হয়েছিল, তাতে দেখা যায় যে, তৎকালীন হিন্দুসম্প্রদায়ের জাতি-বিপন্নতার জন্য এতে লালন ও তাঁর সম্প্রদায়কেই দায়ী করা হয়েছিল। আসলে লালন তাঁর জীবদ্দশায় বাংলায় জাতি-ভেদহীন হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সাধনার যে অভিনব প্রেক্ষাপটটি রচনা করেছিলেন, তৎকালীন হিন্দু সমাজনেতারা এটিকে অনুমোদন করেন নি। এপ্রসঙ্গে ‘গ্রামবার্তা’র নিবন্ধকার তখন তাঁর পূর্বোক্ত নিবন্ধের একজায়গায় মন্তব্য করেছিলেন—
“... এদিকে ব্রাহ্মধর্ম জাতির পশ্চাতে খোঁচা মারিতেছে, ওদিকে গৌরবাদিরা তাহাকে আঘাত করিতেছে, আবার সে দিকে লালন সম্প্রদায়িরা, ইহার পরেও স্বেচ্ছাচারের তাড়না আছে। এখন জাতি তিষ্ঠিতে না পারিয়া, বাঘিনীর ন্যায় পলায়ন করিবার পথ দেখিতেছে।”
অন্যদিকে ১৯০০ সালে প্রকাশিত মৌলভী আবদুল ওয়ালীর ‘On Curious Tenets and Practices of a certain Faqirs in Bengal’ নামক প্রবন্ধেও লালন সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত ও মন্তব্য পাওয়া যায়। এই প্রবন্ধের একজায়গায় বাংলার মুসলমান বাউল-ফকিরদের সম্পর্কে প্রবন্ধকার বলেছিলেন—
“The so-called Musalman Faqirs speaking to another Musalman try their best to argue against Islam, and to misinterpret or misquote passages in support of their doctrines.” (The Journal of the Anthropological Society of Bombay, Vol. V, No. IV, P- 218)
এসব থেকে বুঝতে পারা যায় যে, বাংলার বাউল-ফকিদের সম্পর্কে এগুলোই তখন প্রায় সর্বজনীন ধারণা ছিল, এবং বলা বাহুল্য যে, বাউলশ্রেষ্ঠ লালনও তখন এই ধারণার আওতামুক্ত ছিলেন না।
এর আগে মুন্সী এমদাদ আলী (১৮৮১–১৯৪১) প্রণীত ‘রদ্দে নাড়া’ (অপ্রকাশিত, ২৪শে আষাঢ়, ১৩২৪ বঙ্গাব্দ) পুঁথিতে বাংলার বাউল বা ‘নাড়ার ফকির’দের বিশদ পরিচয় দিয়ে তাঁদের তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা করা হয়েছিল বলে লক্ষ্য করা যায়। এতে লেখক প্রসঙ্গক্রমে পুঁথির ভূমিকার একজায়গায় সরাসরি লালন শাহের নামোল্লেখ করেই বলেছিলেন—
“নাড়া ইত্যাদী ইত্যাদী ইহাদিগের মধ্যে আমাদের দেষে এই নাড়ার হট্টগোলই বেশী। আমাদের দেষে প্রধানত দুই শ্রেণীর নাড়া দেখিতে পাওয়া জায়। এক শ্রেণীর নেতা জেলা নদীয়া মহকুমা কুষ্টিয়ার অধিন ছেঁওড়ীয়ানিবাসী লালন সা তাহার রচিত বহুবিধ গান লোকমুখে প্রচলিত আছে। কিন্তু রচিত কোন পুস্তকাদী নাই। ... নাড়ার ধর্ম সম্বন্ধেও আমি যতদূর নিজে অবগত হইয়াছি ইনশাআল্লা পাঠক-পাঠীকাগণের নিকট উপস্থিত করিব বাসনা করিয়াছি। ইহার দ্বারা মছলেম সমাজে কোন উপকার হইলে শ্রম সফল জ্ঞান করিব।” (লালন স্মারকগ্রন্থ, আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত, ঢাকা, চৈত্র, ১৩৮০ বঙ্গাব্দ, পৃ: ১১৬-১৭)
এরপরে লেখক বাউল বা ‘নাড়াধর্ম’ সম্পর্কে বলেছিলেন—
“নাড়া যে কি ধৰ্ম্ম তাহা ব্যাক্ত করা বড়ই দূরহ। এমন অসভ্য অশ্লীল ব্যবহার জগতে কোন মনুষ্যের দ্বারা হইতে পারে এমন বিশ্বাস হয়না।” (লালন স্মারকগ্রন্থ, আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত, ঢাকা, চৈত্র, ১৩৮০ বঙ্গাব্দ, পৃ- ১১৭)
সমকালে পূর্ববঙ্গের রংপুর জেলার বাঙ্গালীপুর-নিবাসী মওলানা রেয়াজউদ্দীন আহমদ আবার মুসলমানদের মধ্যে ‘বাউলধ্বংস ফৎওয়া’, অর্থাৎ—‘বাউলমত ধ্বংস বা রদকারী ফৎওয়া’ প্রণয়ন ও প্রচার করেছিলেন বলে জানা যায়। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে তাঁর এই ‘ফৎওয়া’র দ্বিতীয় পরিবর্ধিত সংস্করণটি প্রকাশিত হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, তৎকালীন বাংলার মুসলমান সমাজের প্রসিদ্ধ ওলামা ও নেতৃবৃন্দ বাউলদের বিরুদ্ধে তাঁর এই ফতোয়াকে সমর্থন ও অনুমোদন করেছিলেন। যারফলে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে ‘বাউল ধ্বংস ফৎওয়া’র ২য় খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল। আর এই ২য় খণ্ডের প্রধান উল্লেখ্য বিষয় ছিল লালন শাহ সম্পর্কে লেখকের মন্তব্যসহ একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা,—যা থেকে আজও লালন সম্পর্কে তৎকালীন বাঙালি মুসলিম সমাজ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের মনোভাব এবং দৃষ্টিভঙ্গির যথার্থ পরিচয় পাওয়া যায়। এই ‘ফৎওয়া’র ২য় খণ্ডে ১৩৩২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসের ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় বসন্তকুমার পালের ‘ফকির লালন সাহ’ নামক প্রবন্ধটি উদ্ধৃত করে লেখক মন্তব্য করেছিলেন—
“লালন সাহের জীবনী পাঠে বুঝা যায় লালন সাহার ধর্ম্মের কোনই ঠিক ছিল না। বরঞ্চ তাঁহার ভাবের গান ও কবিতাবলির ভিতর দিয়া পরিস্ফুটিত হয় যে তিনি হিন্দু জাতির একজন উদাসীন ছিলেন। তিনি কেবল মোছলমানের হস্তে অন্নব্যঞ্জনাদি ভোজন করিয়াছিলেন বলিয়াই, হিন্দুসমাজ তাঁহাকে সমাজচ্যুত করিয়াছিলেন। তিনি মোছলমানের অন্ন ভোজন ব্যতীত, এছলাম গ্রহণ করেন নাই, বা মোছলমান বলিয়া নিজকে স্বীকার করেন নাই বা এছলামের আকিদা, বিশ্বাস ও নামাজ, রোজা প্রভৃতির কোন চিহ্নই কিম্বা আচারব্যবহার কিছুই তাঁহার মধ্যে বর্ত্তমান ছিল না, যদ্বারা তাঁহাকে মোছলমান বলা যাইতে পারে, তিনি এছলামের হোলিয়া অনুসারে মোছলমানের দরবেশ ফকির হওয়া দূরে থাক একজন মোছলমান বলিয়াও পরিগণিত হইতে পারন না, তিনি যত বড়ই মুনি-ঋষি, উদাসীন হউন না কেন, মোছলমানের তিনি কেহই নহেন। কেহ মোছলমানের অন্ন খাইয়াই মোছলমান হইতে পারেন না। কারণ অনেক অমোছলমানই মোছলমানের পাকে ভোজন করিয়া থাকে। যাঁহার মধ্যে এছলামের রীতি-নীতি ও কার্য্যকলাপগুলি শরীয়তের কাটায় মিলিবে না, তিনি মুনি ঋষি, দরবেশ ফকির যে কোন নামেই পরিচিত হউন না কেন, মোছলমান তাঁহাকে কোনই শ্রেণীমধ্যে পরিগণিত করিয়া লইতে পারেনা। অতএব লালন সাহার মধ্যে শরীয়তের চিহ্ন না থাকায় তিনি মোছলমান সম্প্রদায়ভুক্ত নহেন। সুতরাং বাউল বা ন্যাড়ার ফকিরগণ যে লালন সাহাকে মোছলমানের সেরা পীর, দরবেশ বলিয়া তাঁহার পদ অনুসরণকরতঃ মোছলমানের দরবেশ ফকিরের দাবী করিয়া দুনিয়াটাকে তোলপাড় করিয়া তুলিয়াছে, ইহা তাঁহাদের সর্বৈ পথভ্রষ্টের পরিচয় মাত্র।
লালন সাহার পরিচয় ত ইহাই দাঁড়াইল কিন্তু বাউল, ন্যাড়ার ফকিরগণ লালন সার সম্বন্ধে কোনই পরিচয় না জানিয়া হুজুগে মাতিয়া হিন্দু বৈষ্ণবগণের দেখাদেখি লালন সার পদে গা ঢালিয়া দিয়া মোছলমান সমাজের কলঙ্কস্বরূপ হইয়াছে ইহা অতিশয় পরিতাপের বিষয়। তাঁহাদের ধাঁধা এখন ঘুচিবে কি?” (বাউলধ্বংস ফৎওয়া, ২য় খণ্ড, মৌলবী রেয়াজউদ্দীন আহমদ, রংপুর, ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ, পৃ: ২৫-২৬)
সমকালে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮–১৯৬৮) বাংলার মুসলমান সমাজের একজন প্রধান মুখপাত্র ছিলেন। আজও ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর বাঙালি মুসলমানদের শিক্ষা-সংস্কৃতি-রাজনীতি ও ধর্ম বিষয়ে আকরম খাঁর মতামতকে গবেষকরা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে থাকেন, এবং এমনকি তাঁর সময়েও বাঙালি মুসলমান সমাজে তাঁর মতামত ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বলেই গণ্য করা হত। কিন্তু এই মোহাম্মদ আকরম খাঁও বাংলার বাউল-ফকিরদের সম্পর্কে প্রতিকূল মত পোষণ করতেন বলে বাংলায় বাউল-মতের প্রসারকে তিনি বাঙালি মুসলিম সমাজের চারিত্রিক ও নৈতিক অধঃপতনের একটি প্রধান কারণ বলে গণ্য করেছিলেন। এপ্রসঙ্গে তিনি তাঁর ‘মোছলেমবঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’ নামক গ্রন্থে লিখেছিলেন—
“তৃতীয় যুগ তথা পতন যুগের শেষ দশকগুলির সমাপ্তির দিকে উপরে বর্ণিত (পৃ: ১১১-১৭) কলুষিত পরিবেশের প্রভাবে বাংলার মুসলিম-সমাজ নৈতিক অধঃপতন ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার এক অতি শোচনীয় স্তরে নামিয়া যায়। এই অধঃপতনের নজীর হিসাবে আমরা এখানে (পৃ: ১১৭-২০) মুসলমান মারফতী ফকির বা নেড়ার অর্থাৎ মরমীবাদী ভিক্ষুকদের কয়েকটি মত-বিশ্বাস ও সাধন-পদ্ধতির উল্লেখ করিতেছি। এই সমস্ত ফকিরের দল বিভিন্ন সম্প্রদায় উপসম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল—যাহা আউল, বাউল, কর্তাভজা ও সহজিয়া ইত্যাদি হিন্দু বৈষ্ণব অথবা চৈতন্য সম্প্রদায়ের মুছলিম সংস্করণ ব্যতীত কিছু ছিলনা।” (মোছলেমবঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, ঢাকা, অগ্রহয়ণ, ১৩৭২ বঙ্গাব্দ, পৃ- ১১৭)
এরপরে এই একই গ্রন্থের ২০’শ অধ্যায়ে ‘সামাজিক জীবনের মারাত্মক ব্যাধি’ প্রসঙ্গে আকরম খাঁ
—“মোছলেমসমাজ যে কিরূপ সম্বিতহারা ও কর্তব্য-বিমুখ হইয়া পড়িয়াছিল”
—একথা যথাযথভাবে আলোচনা করে, অতঃপর—“সম্পূর্ণ বিষয়টি স্পষ্ট করার মানসে”—লালন শাহের ৬টি ও পাগলা কানাইয়ের ১টি গান সম্পূর্ণ বা আংশিক উদ্ধৃত করে এঁদের ইসলামধর্ম ও ঐতিহ্যবিরোধী মনোভাবের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন। এথেকে বুঝতে পারা যায় যে, ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর বাংলার ধর্মনিষ্ঠ শিক্ষিত মুসলমানরা লালন শাহকে কোনদিনই সুনজরে দেখেননি, এবং মওলানা আকরম খাঁর উপরিউক্ত বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত আসলে তাঁদের এই মনোভাষ্যেরই পরিচায়ক ছিল।
এছাড়া ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত মওলানা আবু ইমরান হোছাইন প্রণীত ‘জওয়াবে ইবলিস’ নামক পুস্তিকায় শরীয়তের কষ্টিপাথরে বাংলার বাউল-সম্প্রদায়ের চিন্তাদর্শন ও লালনের গানের আলোচনা করা হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। এতে ‘বাউলগণের স্বরূপ’ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক বলেছিলেন যে, বাংলার বাউলরা কোথাও কোথাও ‘মারেফতি’, তো কোথাও আবার ‘মুতখেকো ফকির’ নামে পরিচিত। আর এই পুস্তিকায় ‘ইসলাম সম্পর্কে লালনের হটোক্তি’ নামক অধ্যায়ে লালনের ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’ নামক গানটির একটি বিশেষ স্তবকের অর্থব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখক জানিয়েছিলেন—
“তথাকথিত মারফতির কাণ্ডারী লালন শাহ গানের মাধ্যমে ত্বকচ্ছেদ লইয়া ‘জাতিবিচার’ কবিতায় ইসলামের ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করিয়া যে মন্তব্য করিয়াছেন তাহাতে তাঁহার সীমাহীন মূর্ছতাই প্রকাশ পাইয়াছে মাত্র। ... আল্লার কালাম কিম্বা রাছুলের হাদীছে একথা বলা হইলে মুসলমানদের তরফ হইতে কিছু বলার ছিল না। কোরান-হাদীছের কোথাও এরূপ উদ্ভট উক্তি করা হয় নাই। অথচ সেই শাশ্বত ইসলামের উপরে কামড় দিতে গিয়া লালন শাহ স্বীয় বিষদন্তই ভগ্ন করিয়াছেন মাত্র।” (জওয়াবে ইবলিস, মওলানা আবু ইমরান হোছাইন, কুষ্টিয়া, ১৯৬৮ সাল, পৃ: ৩৩-৩৪)
অন্যদিকে মোঃ আবু তাহের বর্দ্ধমানী রমজান ১৪০০ হিজরীতে প্রকাশিত তাঁর ‘সাধু সাবধান’ নামক পুস্তিকায় বাংলার বাউল সম্প্রদায় ও লালন ফকিরের কঠোর সমালোচনা করে লালনকে
—“ইসলামবিরোধী, শরিয়তবিরোধী, বেশায়াত, বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট ফকির”
—বলে অভিহিত করে মন্তব্য করেছিলেন—
“লালন আল্লাহকে ও আল্লার সৃষ্ট মানুষকে একাকার করে দিয়েছে। লালনের গানে আছে শঙ্করাচার্য্যের অদ্বৈতবাদ, লালনের গানে আছে নর-নারীর অবাধ মিলনের প্রেরণা, লালনের গানে আছে গুপ্ত যৌন প্রক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়ায় গভীর উৎসাহ, লালনের গানে আছে নাপাক দ্রব্য ভক্ষণ করায় প্রেরণা; লালনের গানে আছে তৌহিদ-বিরোধী কালাম। লালনের গানে আছে শরীয়তবিরোধী কথা। লালন আজ নাই, কিন্তু লালনের হাজার হাজার রূহানী সন্তান বিরাজ করছে। তাঁর ষড়যন্ত্র ও কুমন্ত্রণার জালে ফেলে হাজার হাজার মানুষকে সে বিভ্রান্ত করে গেছে।” (সাধু সাবধান, মোঃ আবু তাহের বর্দ্ধমানী, দিনাজপুর, রমজান, ১৪০০ হিজরী, পৃ: ৩১-৩২)
এরপরে ম. আ. সোবহান তাঁর ‘বাউল একটি ফেতনা’ নামক রচনায় লালনকে ‘বাউলদের নবপয়গম্বর’ বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন। (আল-জাদীদ–২, বাউল একটি ফেতনা, ম. আ. সোবহান, কুষ্টিয়া, ২২শে মে ১৯৮৬ সাল, পৃ- ৬) এছাড়া অন্যত্র তিনি লালনকে সরাসরি ‘নারীভজনকারী’ বলে নিন্দা করে বলেছিলেন—
“নারীভজন মতবাদ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল লালন শাহের একমাত্র সাধ্যসাধনা।” (সাপ্তাহিক ইস্পাত, নারীভজনকারী বাউল লালন শাহ, ম. আ. সোবহান, কুষ্টিয়া, ১৬ই নভেম্বর ১৯৮৯ সাল)
এসব ছাড়া ইতিহাস একথাও বলে যে, লালনের সমকালে যেমন, তাঁর দেহত্যাগের পরেও তেমনি তাঁর অনুসারীদের উপরে বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কম অত্যাচার করেননি। আর পূর্ববঙ্গের কুষ্টিয়া অঞ্চলেই তখন এধরণের ঘটনা সবথেকে বেশি ঘটেছিল। আর এপ্রসঙ্গে এখানে প্রথমেই কুষ্টিয়ার বানিয়া-পাড়ানিবাসী মওলানা আফছারউদ্দীন আহমেদের (১৮৮৭-১৯৫৯) লালন-বিরোধী আন্দোলনের কথা উল্লেখ্য। ইনি দেশভাগের আগে বাংলা সরকারের মন্ত্রী শামসুদ্দীন আহমেদের (১৮৮৯–১৯৬৯) মধ্যাগ্রজ ছিলেন। সমকালীন বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায় যে, আফছারউদ্দীন ১৩৫৩ বঙ্গাব্দের দোল-পূর্ণিমার বার্ষিক উৎসবে ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় আগত অনেক বাউলের মাথার ঝুঁটি ও বাবরি বলপূর্বক কেটে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁর এই আন্দোলনের ফলে লালন-প্রশিষ্য—ছেঁউড়িয়ার ইসমাইল শাহ ফকির তখন প্রাণভয়ে দীর্ঘকাল ধরে গৃহছাড়া হয়েছিলেন। এমনকি আফছারউদ্দীনের জীবদ্দশায় লালনের আখড়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বাউল-ফকিরদের কোন অনুষ্ঠানই সাড়ম্বরে হতে পারেনি।
এরপরে কুষ্টিয়ারই মওলানা মেছবাহুর রহমানের (১৯০৭-১৯৮৭) নেতৃত্বে এবিষয়ে বিশেষ তৎপরতা পরিচালিত হয়েছিল, এবং তিনি তখন লালনপন্থীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বহাসে অংশগ্রহণ ও প্রচারপত্র বিলি করেছিলেন। বিশেষ করে বিংশ শতকের ষাটের দশকের সূচনার কুষ্টিয়ায় লালন স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সময়ে ইনি এর তীব্র নিন্দা ও বিরোধিতা করেছিলেন। এছাড়া এর কয়েক বছর পরে ১৯৬৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে যখন লালনের নামানুসারে কুষ্টিয়া জেলার নতুন নামকরণের প্রস্তাব করা হয়েছিল, তখন এই প্রচেষ্টার প্রতিবাদে মেছবাহুর রহমান কুষ্টিয়ার পাক প্রেস থেকে যে প্রচারপত্রটি প্রকাশ করে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন, সেটার প্রাসঙ্গিক অংশ নিম্নরূপ ছিল—
“... শোনা যাচ্ছে কুষ্টিয়া জেলার নাম পরিবর্তন করে ‘লালনশাহী’ এবং কুষ্টিয়া শহরের নাম পরিবর্তন করে ‘লালননগর’ করার ষড়যন্ত্রে কেউ কেউ মেতে উঠেছেন এবং তা জেলা কাউন্সিলের সভায় পাশ করানোর চেষ্টা করছেন।
সকলেই জানে লালন একজন বেদ্বীন, বেশরা, জাত-ধর্মহীন নাড়ার ফকির যাঁদেরকে কুষ্টিয়াবাসী ঘৃণাই করে থাকে। লালনের ধর্মমতের ‘চারিচন্দ্রভেদ’, ‘ষড়চক্র’, ‘মূলাধারচক্র’, ‘দ্বীদলপদ্ম’, ‘সহস্র-দলপদ্ম’, ‘অধর মানুষ’, ‘সহজ মানুষ’, ‘ত্রিবেণী’, ‘আল’, ‘বিন্দু’, ‘সাধন-সঙ্গিনী’, ‘প্রেমভাজা’ প্রভৃতি কাম আরাধনার ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দসমূহের তাৎপর্য কি তা জানলে বা তাঁর অবতারবাদের সংবাদ জানলে যে কোন রুচিসম্পন্ন মানুষ লালন এবং তাঁর অনুসারীদের নাম মুখে আনতেও ঘৃণা বোধ করবে।
কিংবদন্তীর উপর ভিত্তি করে সত্য জানবার কোন প্রকার চেষ্টা না করে কিছু সংখ্যক ক্ষমতাবান জ্ঞানপাপী একটা নূতন কিছু করে হঠাৎ যশস্বী হওয়ার চেষ্টায় মেতে উঠেছেন। তাঁরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জনমতের প্রতি ভ্রূক্ষেপও না করে জনসাধারণের অর্থের শ্রাদ্ধ করে গঞ্জিকাসেবনের আখড়া এবং কবরপূজার কেন্দ্র উদ্বোধন করুন, তাতে আমরা তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করলেও, বাধা দিতে না পারায় আপাতঃ নীরবতা অবলম্বন করে থাকতে পারি, কিন্তু তাঁদের অপচেষ্টা যদি জনসাধারণকেও মানাতে বাধ্য করার ষড়যন্ত্র করে খাকেন, তবে তাঁদের স্মরণ রাখতে অনুরোধ করছি হিসাবে তাঁদের মারাত্মক ভুল হয়ে যাচ্ছে। কুষ্টিয়ার জনসাধারণ এই হীন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করছে।” (লালন স্মারকগ্রন্থ, আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত, ঢাকা, চৈত্র, ১৩৮০ বঙ্গাব্দ, পৃ: ১২৩-২৪)
তবে ঊনবিংশ-বিংশ শতকের বাংলার মুসলিম সমাজের ধর্মবেত্তাদের পাশাপাশি কিছু শিক্ষিত সুধীজনের কাছে লালনের ধর্ম ও সাধনাই শুধু নিন্দিত হয়নি, বরং তাঁর সাঙ্গীতিক প্রতিভাও সমভাবে অস্বীকৃত হয়েছিল। যেমন—ত্রিপুরা জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মেলনের চতুর্থ অধিবেশনে শিক্ষাবিদ ডঃ মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন মন্তব্য করেছিলেন যে, লালনসহ অন্যান্য লোককবিরা যেসব গান রচনা করে গিয়েছেন
—“তাহাতে যথেষ্ট রসবোধের পরিচয় নাই”,
এবং—
“এগুলি গ্রাম্যতাদোষে দুষ্ট বলিয়া ভদ্রসমাজে স্থান করিয়া লইতে পারে নাই।” (হারামণি, ২য় খণ্ড, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, বাংলা একাডেমী সংস্করণ, পৌষ, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ, পৃ- ২০৪)
এমনকি সেযুগের কোনো কোনো মুসলিম লেখক আবার বাউলগানকেই পাকিস্তানের আদর্শ-বিরোধী বলেও মনে করেছিলেন। আর ইবনে তালিব ওবায়দুল্লাহ তাঁর ‘বাউলের ইতিকথা’ নামক প্রবন্ধে তো মূলতঃ লালনের গানকে অবলম্বন করেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। (সাপ্তাহিক যোগাযোগ, বাউলের ইতিকথা, ইবনে তালিব ওবায়দুল্লাহ, কুষ্টিয়া, ১২ই মার্চ ১৯৬৫ সাল)
তবে ঊনবিংশ-বিংশ শতকের বাংলায় বাউলদের বিরুদ্ধে মূলতঃ মুসলমানদের পরিচালিত এসব আন্দোলন সম্পর্কে সমকালীন মুক্তমন বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কেউ কেউ প্রতিবাদও জানিয়েছিলেন; এবং ধর্ম ও সমাজ-সংস্কারের নামে বাউলদের উপরে অত্যাচার-নিগ্রহকে তাঁরা সমর্থন করেননি। এঁদের মধ্যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পুরোধা কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪–১৯৭০), ক্ষিতিমোহন সেন প্রমুখের নাম আলোচ্য প্রসঙ্গে এখানে উল্লেখযোগ্য। এঁদের মধ্যে বাংলার বাউলদের উপরে মুসলিম সমাজের নির্যাতন প্রসঙ্গে আবদুল ওদুদ বলেছিলেন—
“এই মারফত-পন্থীর বিরুদ্ধে আমাদের আলেম-সম্প্রদায় তাঁদের শক্তি প্রয়োগ করেছেন, আপনারা জানেন। এই শক্তি প্রয়োগ দূষনীয় নয়—সংঘর্ষ চিরদিনই জগতে আছে এবং চিরদিনই জগতে থাকবে। তা ছাড়া এক যুগ যে সাধনাকে মূর্ত করে তুলল, অন্য যুগের ক্ষুধা তাতে নাও মিটতে পারে। কিন্তু আলেমদের এই শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে কথা বলবার সবচাইতে বড় প্রয়োজন এইখানে যে সাধনার দ্বারা সাধনাকে জয় করবার চেষ্টা তাঁরা করেননি, তার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত দুর্বলকে লাঠির জোরে তাঁরা দাবিয়ে দিতে চেয়েছেন। এ-দেশী মারফতপন্থীদের সাধনার পরিবর্তে যদি একটা বৃহত্তর পূর্ণতর সাধনার সঙ্গে বাংলার যোগসাধনের চেষ্টা আমাদের আলেমদের ভিতরে সত্য হতো, তাহলে তাঁদের কাছ থেকে শুধু বাউলধ্বংস আর নাসারা দলন ফতোয়াই পেতাম না।” (শাশ্বত বঙ্গ, কাজী আবদুল ওদুদ, কলিকাতা, ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ, পৃ- ৩৩৬)
পরিশেষে উল্লেখ্য যে, বাংলায় বাউল-বিরোধী আন্দোলনের কোনো ধারাবাহিক ইতিহাস না থাকবার কারণে এই মরমীসাধকদের বিভিন্ন সময়ে যে কি অমানুষিক অত্যাচার ও নির্মম নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছিল—এসবের কোন হিসাব পাওয়া যায় না। তবে ঊনবিংশ-বিংশ শতকের বাংলায় যে, একতারার বিরুদ্ধে লাঠির সংগ্রাম চলেছিল; এবং এই ঘটনা যে তৎকালীন বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় ছিল—এবিষয়ে গবেষকমহলে কোন দ্বিমত দেখতে পাওয়া যায় না। আর এসময়ে লালন শাহই বাংলার বাউলদের প্রাণপুরুষ ও কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হওয়ার ফলে প্রায় সব আঘাতই তাঁর অথবা তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যদের উপরে এসে পড়েছিল। একারণেই অতীতে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য যথার্থই বলেছিলেন—
“শরীয়তবাদী মুসলমানগণ লালনকে ভালো চোখে কোনোদিনই দেখেন নাই। এ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল লালনের খ্যাতি-প্রতিপত্তির দিনেও তাঁহাকে নিন্দা করিয়াছে। ... এই বাউলপন্থী নেড়ার ফকিরেরা চিরকাল অপমানিত ও লাঞ্ছিত হইয়াছে।” (বাংলার বাউল ও বাউল গান, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, দ্বিতীয় সংস্করণ, কলিকাতা, নববর্ষ, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ, পৃ- ৫৪৫)
আর তাই লালনের—
“এ দেশেতে এই সুখ হলো আবার কোথা যাই না জানি”
—গানটিতে গূঢ়তত্ত্ব ছাপিয়ে তাঁর নিজের নিপীড়িত জীবনের মর্মবাণীই যেন ফুটে উঠেছিল বললে ভুল কিছুই বলা বলা হয় না।















0 Comments