মূর্তিপূজা নয়, মৃণ্ময় মাঝে চিন্ময় দেখি - এন এন তরুণ

মূর্তিপূজা নয়, মৃণ্ময় মাঝে চিন্ময় দেখি - এন এন তরুণ
এন এন তরুণ

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২৩ । ০০:০০ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২৩ । ১৩:৫৪ ।


মানুষ যদি অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কেও কিছুটা জ্ঞান রাখে, তাহলে সমাজে সাম্প্রদায়িকতা অনেকটাই কমে যাবে। অন্য দর্শনেরও যে একটা যৌক্তিক দিক থাকতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করা দরকার। অন্যের দর্শন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়। ফলে একমাত্র নিজের ধর্মই ভালো আর অন্যগুলো খারাপ– এ রকম একটা মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে। ‘হিন্দুরা মূর্তিপূজা করে’– অনেক বড় হয়েও এ কথা শুনেছি, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর কাছে উপহাসের পাত্র হয়েছি। তাদের বক্তব্য হলো, ‘তোমরা মাটির তৈরি পুতুলকে শাড়ি পরাও, গহনা পরাও, খাবার দাও, ফুল-জল দাও এবং এক সময় সেটা নদীর জলে ডুবিয়ে দিয়ে এসো। কী হাস্যকর ব্যাপার।’ হিন্দুর ঘরে জন্ম নেওয়ার কারণে এ কথাগুলো প্রায়ই শুনতে হতো এবং ভীষণ রকম মন খারাপ হয়ে যেত। স্বামী বিবেকানন্দ বিষয়টা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে:

‘পুতুল পূজা করে না হিন্দু কাঠ মাটি দিয়ে গড়া মৃণ্ময় মাঝে চিন্ময় হেরে হয়ে যাই আত্মহারা’ তার মানে, ‘মূর্তিপূজা’ কথাটাই আসলে ভুল। সনাতন ধর্ম বিশ্বাস করে, সর্বভূতে ঈশ্বর বিরাজিত। অতএব, মূর্তি বা প্রতিমার মধ্যেও বিরাজিত অর্থাৎ এর মধ্যে যে ঈশ্বর বাস করেন, হিন্দু আসলে তাঁরই পূজা করেন– মূর্তিকে পূজা করেন না। অধিকন্তু ভক্তের কল্পনায় ঈশ্বরের বা দেব-দেবীর যে রূপ, সে রকম একটা অবয়ব তৈরি করে তাতে মন স্থির করলে আরাধনায় একাগ্রতা আসে, একটা পবিত্র আবহ সৃষ্টি হয়। স্বামী বিবেকানন্দ একবার আলোয়ারের মহারাজের বাড়িতে অতিথি হয়েছিলেন। সেখানে রাজা মূর্তি পূজার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। হঠাৎ স্বামীজির চোখে পড়ল দেয়ালে টাঙ্গানো একটা ছবির দিকে। তিনি বললেন, 

‘এটা কার ছবি?’ 


ভদ্রলোক জানালেন, 

এটা তাঁর বাবার ছবি। 


স্বামীজি তখন বললেন, 

আপনি কি ওই ছবির ওপর থুতু ফেলতে পারেন?’ 


গৃহকর্তা বললেন, 

‘অসম্ভব। আমার বাবার ছবির ওপর আমি থুতু ফেলব কেন?’ 


বিবেকানন্দ বললেন, 

‘অবশ্যই আপনি আপনার বাবার ছবির ওপর থুতু ফেলবেন না। আর ফেলবেন না তার কারণ, এটা আপনার বাবার ছবি। ছবিটা আপনার বাবার প্রতিকৃতি এবং আপনার বাবার মতোই ওই ছবিটাকে আপনি ভক্তি করেন। ঈশ্বর বা দেব-দেবী মানুষের কল্পনায় একটা অবয়ব ধারণ করে এবং কাঠ-মাটি দিয়ে ওই অবয়বের একটা মূর্তি মানুষ তৈরি করে। মানুষ আসলে মূর্তিটিকে পূজা করে না। পূজা করে মূর্তির ভেতরে যে ঈশ্বর বা দেব-দেবীর অবয়ব, তাঁকে।’


‘যত্র জীব, তত্র শিব’– এই দর্শনের একটা সাম্যের দিক আছে। মানুষ যদি মানুষকে শিব তথা ঈশ্বর জ্ঞান করেন, তাহলে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর হবে। অর্থাৎ মুচি, ব্রাহ্মণ, শূদ্র, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ– সবার মধ্যকার শিবের উপস্থিতি মানুষকে সাম্যের দৃষ্টিতে দেখতে সাহায্য করবে। মহাভারতে আমরা চমৎকার একটা গল্পের সন্ধান পাই। যেখানে নিচু জাতের সন্তান হওয়ার কারণে দ্রোণাচার্য যখন একলব্যকে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা দিতে রাজি হলেন না, তখন একলব্য দ্রোণাচার্যের একটা মূর্তি বানিয়ে সেই ‘মূর্তির কাছে থেকে’ অস্ত্রবিদ্যা রপ্ত করা শুরু করলেন এবং এক সময় অর্জুনের সমকক্ষ বা তার চেয়েও বড় ধনুর্ধর বনে গেলেন। এই গল্পের মধ্যে একদিকে গুরুভক্তি, অন্যদিকে একাগ্রভাবে সাধনা করলে সিদ্ধি লাভ করা যায়, এই শিক্ষা পাই। তবে আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ আরও একটি শিক্ষা হলো আত্মশক্তির জাগরণ। উপনিষদে মানুষকে ‘অমৃতস্য পূত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে অর্থাৎ মানুষ অনন্ত শক্তির আধার। এই অনন্ত শক্তির স্ফুরণ ঘটানোই মূল কাজ। গুরুর কৃপা একটা উপলক্ষ মাত্র বা বড় জোর একটা প্রেরণা। স্বামী বিবেকানন্দ যথার্থই বলেছেন, 

‘মানুষের মধ্যে যে শক্তির পরাকাষ্ঠা ইতিমধ্যেই বিদ্যমান, তার প্রকাশ ঘটানোই শিক্ষার উদ্দেশ্য।’


মার্কসীয় পণ্ডিত শিবদাস ঘোষ তাঁর পার্টির কর্মীদের আন্তঃধর্মীয় বিবাহে উৎসাহিত করতেন। তিনি মনে করতেন, সমাজে ব্যাপকহারে আন্তঃধর্মীয় বিবাহ হলে সাম্প্রদায়িকতা হ্রাস পাবে। তবে অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার শিক্ষাটা আসতে হবে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে, পিতামাতার কাছ থেকে এবং সমাজ তথা পরিপার্শ্ব থেকে। এমনকি জাতীয় নেতারা কী রকম আচরণ করেন, তাও শিশু-কিশোরদের মনে একটা ছাপ ফেলে। অর্থাৎ জাতীয় নেতারা যদি একটা অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়তে চান, তাহলে তাদের আচরণ ও কথাবার্তায় তার নিদর্শন রাখতে হবে।


সেক্যুলারিজম তথা ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ ছাড়া সমষ্টির উন্নয়ন হয় না– উন্নয়নের ইতিহাস সে কথাই বলে। অতএব এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থা দরকার, যেখান থেকে শিশু-কিশোররা সেক্যুলার হয়ে গড়ে উঠবে। এর জন্য নিজ ধর্মের পাশাপাশি অন্য ধর্ম ও নীতিশাস্ত্র সম্পর্কেও জ্ঞান থাকতে হবে। সবচেয়ে ভালো পন্থা হলো, প্রচলিত সব ধর্ম সমন্বয়ে ‘মোরাল সায়েন্স’ বা নীতিবিজ্ঞান নামে একটা বই থাকা; যার মধ্যে নাস্তিক্যবাদী দর্শনও থাকবে। শিশু-কিশোরদের এই তথ্যটিও জানা দরকার, সমাজে কিছু মানুষ আছে যারা নিরীশ্বরবাদী অর্থাৎ তারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না।


প্রসঙ্গত, বৌদ্ধরা যে জীবনব্যবস্থা অনুসরণ করেন, তা-ও কিন্তু একটা নিরীশ্বরবাদী দর্শন। ভগবান বুদ্ধ সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অনুভব করেননি বলেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে নীরব ছিলেন। এ রকম একটা শিক্ষাব্যবস্থা জরুরি অনুভূত হয় যখন দেখি বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মৌলবাদীদের হাতে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের অপরাধ, তারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেকে আহমদীয়াদের অস্তিত্ব স্বীকার করতে এবং সমাজে তাদের অবস্থান মানতে চান না, অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। কিন্তু কাউকে বাদ দিয়ে সমষ্টির উন্নয়ন হয় না বরং উন্নয়ন হলো একটা দেশের সব মানুষের অংশগ্রহণে সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। সংখ্যালঘুরা যদি নিজেদের শিকড়বিহীন ভাবেন, তাহলে এই সমন্বিত প্রচেষ্টা সম্ভব হয় না। তাদের চিন্তায় তখন থাকবে অন্য দেশের উন্নয়ন, অন্য দেশে টাকা-পয়সা পাচার করে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর চিন্তা। একটা কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, উন্নয়নের উদ্দেশ্য হলো ওয়েলবিং তথা সুখ, কিন্তু একটা অশান্ত সমাজে কেউই সুখী হতে পারে না। কারণ দেশ থেকে যদি সংখ্যালঘুরা চলে যেতে থাকে, সমাজ অশান্ত হতে বাধ্য। শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান ছাড়া একটা সমাজ চলতে পারে না– এ সত্যটা উপলব্ধি করা কঠিন কোনো বিষয় নয়।


একটা সমাজে বা দেশে শুধু এক ধর্মেরই লোক বাস করবে– এটা অলীক কল্পনা মাত্র। ভারত থেকে হিন্দু ভিন্ন অন্য সব ধর্মের লোক, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে মুসলমান ভিন্ন অন্য সব ধর্মের লোক, মিয়ানমার থেকে বৌদ্ধ ভিন্ন অন্য সব ধর্মের লোক, ভ্যাটিকান সিটি থেকে খ্রিষ্টান ভিন্ন অন্য সব ধর্মের লোক বের করে দেওয়ার মতো এমন অলীক ভাবনা কোনো সুস্থ মানুষ করতে পারেন না। তার মানে হলো, শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান ছাড়া উপায় নেই। শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের জন্য দরকার পরমত-সহিষ্ণু হওয়া আর সে জন্য দরকার অন্যের ধর্ম-দর্শন সম্পর্কে অন্তত কিছুটা জ্ঞান লাভ করা। একটা প্রগতিশীল শিক্ষাব্যবস্থাই পারে একটা পরমত-সহিষ্ণু জনগোষ্ঠী তৈরি করতে। 

ড. এন এন তরুণ, রাশিয়ার সাইবেরিয়ান ফেডারেল ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ


nntarun@gmail.com


সূত্র: সমকাল

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ