দুর্গামণ্ডপে দুর্গা গণেশের মুণ্ডু ভাঙার পরবর্তী গল্প- সুষুপ্ত পাঠক

এলাকায় একটা দুর্গামণ্ডপে দুর্গা গণেশের মুণ্ডু কে বা কাহারা রাতের আঁধারে এসে ভেঙে দিয়ে গেছে। সকালবেলা হনহন করে কাজে বের হচ্ছি, দেখি বেশ ভিড়, থেমে পড়লাম। শত হলেও বাঙালি, পরের বিষয়ে অত্যাধিক কৌতূহল। নিজের কাজের কথা ভুলে ভিড়ের আমজনতা থেকে বিশেষ করে কয়েকজনকে আলাদা করতে পারলাম- পুলিশের একজন দারোগা, সাংবাদিক, আমাদের মসজিদের ইমাম সাব, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ননী বাবু, সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধি (ধরা যাক তার ডাকনাম সুশীল), আর আমজনতার কথা তো বললামই…।

-ঘটনাটা কে ঘটাইল? আমজনতাদের মধ্যে বেকুব কিছিমের একজন প্রশ্ন করে বসলো।

বিরক্ত সুশীল সাহেব বলে উঠলো, বুঝেন না মিয়া কে এই কাম করছে? ‘দুর্বৃত্ত’! এরা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চায়। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে বিতর্কিত করে তুলতে, উন্নয়ন আর অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্থ করতে দেশি ও বিদেশি চক্রান্তে এই ‘দুর্বৃত্তরা’ এসব করে ভারতের কাছে আমাদের খারাপ বানাতে চেষ্টা করছে…।

'দুর্বৃত্ত’ লোকটার কথা অনেক শুনি। একের পর এক আকামকুকাম করে যাচ্ছে তবু কেউ তাকে ধরতে পারছে না! এই লোকটা একজন নাকি এরা একটা দল? এদের ধর্ম কী? বিশেষত মন্দির-অমুসলিমদের উপর যে কোন হামলা হলেই এর নাম চলে আসে। আমার খুবই কৌতূহল একে নিয়ে তাই থামের মতো খাড়া হয়ে সবার কথা শুনতে লাগলাম।

ইমাম সাব বললেন, ইসলাম এসব সমর্থন করে না। ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম…

বেজায়গায় কথা বলে ফেলার কুখ্যাতি আছে আমার। ইমাম সাবের কথার পৃষ্ঠে ফস করে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো, আমাদের ইসলাম ধর্ম তো মূর্তি পূজাকে সমর্থনও করে… নিশ্চয় এগুলো অন্য কারোর কাজ…

ইমাম সাব আমার পরিচিত। সপ্তাহে একদিন নামাজ পড়তে পাড়ার মসজিদে হাজিরা দেই। ইমাম সাব চোখ গোল গোল করে আমার দিকে চেয়ে থেকে বিস্মিতভাবে বললো, কী বললা তুমি? ইসলাম মূর্তি পূজা সমর্থন করে?…নাউযুবিল্লাহ মিন জালেক!

আমি আমতা আমতা করে বললাম, না মানে, আদমকে মাটি দিয়ে বানিয়ে আল্লাহ ফেরেস্তাদের সেজদা করতে বললেন। সবাই সেটা করলেও ফেরেস্তাদের সর্দার করতে অস্বীকার করায় তাকে আল্লাহ ইবলিশ বানিয়ে দিলেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে ইসলাম মূর্তি পূজা সমর্থন করে। না হলে ইবলিশ শাস্তি পেলো কেন…

ইমাম সাব সুশীল সাহেবের দিকে চেয়ে বললেন, খারেজি, বুঝলেন এরাই সেই খারেজি… এরাই শান্তির ধর্মকে বিতর্কিত করতে চায়। মূর্তি পূজা জেনা করার চাইতে খারাপ! আল্লাহ পাকের কাছে শিকর হচ্ছে ক্ষমার অযোগ্য পাপ। আপনে জেনা করে যদি আল্লার কাছে মাপ চান মাপ পাইবেন কিন্তু শিরক করলে কোন মাপ নাই…

সুশীল সাহেব বললেন, হিন্দুদের জন্যও মূর্তি পূজা নিষিদ্ধ এটা হিন্দুরা জানে না। বেদে আছে ‘না তাস্তে প্রাতীমা আস্থি’ অর্থাৎ ঈশ্বরের কোন প্রতিমূর্তি নেই … কেন যে এরা এত টাকা খরচ করে মূর্তি বানিয়ে আবার সেটা ধাক্কা দিয়ে (আসলে কথাটা হবে ‘লাত্থি’ দিয়ে কিন্তু তিনি সুশীল বলে লাত্থি শব্দটা এডিট করে নিয়েছেন) পানিতে ফেলে দেয় হেঃ হেঃ হেঃ…

ইমাম সাবের খ্যাকানি খেয়ে ভিড়ে মুখ লুকালাম। তবে কৌতূহল দমন করতে না পেরে স্থান ত্যাগ না করে কান খাড়া করে রাখলাম।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ননীবাবু বললেন, দেশের সম্প্রীতি নষ্ট করতে একটি চক্র কাজ করছে। সরকার আমাদের যথেষ্ট নিরাপত্তা দিয়েছে। তবু একটি চক্র বারবার এসব সহিংসতা করে চলেছে…

দারোগা সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, নিজেগো জিনিস নিজেরা পাহাড়া দিতে পারেন না? এহন তো জবাবদেহি করতে হইবো আমাগো… এই যে সাংবাদিক আইয়া ছবি তুলতাছে। তারপর এইসব ফেইসবুকে শেয়ার কইরা দেশ মৌলবাদী হইয়া গেছে বইলা চিল্লাচিল্লি শুরু কইরা দিবো… বুঝেন কিছু…!

সুশীল সাহেব বলেন, বাজার অর্থনীতি তো এইসব নব্য ফেইসবুকাররা বুঝে না! এরা জীবনে নোয়ামচমেস্কি এক পাতা পড়ছে? তারা জানে বাংলাদেশে মূর্তি ভাঙা হইলে কারা লাভবান হয়? ঐ বিজেপি! বাংলাদেশে মূর্তি ভাঙলে ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের লাভ হয়। এবারে হিসাবটা করেন, কার লাভে কে কী করতে পারে… মিশেল ফুকো না পড়লে এসব বুঝবে কীভাবে হে হে হে…।

দারোগা সাহেব বললেন, ‘দৃর্বৃত্ত’ যেই-ই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। আইন সবার জন্য সমান…

ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ হো হো হো করে হেসে উঠলো। দারোগা সাহেব চেঁচিয়ে বলল, এ্যাই কে! কে এখানে?… এখানে এত ভিড় কেন? এটা কি তামাশার জায়গা? সন্দেহভাজন হিসেবে দুইচারটা গ্রেফতার করলেই বুঝবি কত ধানে কত চাল…

ম্যাজিকের মতো কাজ হলো দারোগা সাহেবের কথায়। উৎসুক আমজনতা পাতলা হতে থাকলো। সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার হয়ে কে আর যেচে বিপদে পড়তে চায়।

দারোগা সাহেব বললেন, মন্দিরের জমি নিয়ে কোন বিরোধ আছে কিনা খতিয়ে দেখতে হবে। মন্দির কর্তৃপক্ষ এখানে কে আছেন?

ননীবাবু বললেন, জি স্যার আমি আপনার সামনেই…

-শোনেন, জমিজমা টাকাপয়সা নিয়া মন্দির কমিটিতে সমস্যা থাকলে আরেক পক্ষ হামলা চালিয়ে মূর্তি ভাঙে এসব আমার জানা আছে। হুটহাট কোন মন্তব্য কইরা ঝামেলা বাড়াইবেন না। আমরা তদন্ত কইরা বের করার আগে নিজেরা মুখ বন্ধ রাখবেন…

ননীবাবু গদগদ হয়ে বললেন, জি স্যার, মিডিয়া জিজ্ঞেস করলে বলবো দৃর্বৃত্তরা কীসের উদ্দেশ্যে এই কাজ করেছে বুঝতে পারছি না…

আমি যে কোন সময় চাপতে চাপতে দারোগা সাহেবের পিছনে চলে এসেছি বুঝতে পারিনি। মাথায় কিছুই ঢুকছে না। নিজেরা যাকে ভগবান মানে তাকেই এরা হামলা করে ভাঙবে অন্য পক্ষকে ফাঁসাতে? দারোগা সাবের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললাম, স্যার, নিজেরা যাকে ভগবান বলে মানে, যার শাপ-শাপান্ত থেকে বাঁচতে পূজা করে তাকেই ভাঙবে? একটু ভয় করবে না?

দারোগা সাহেব স্থানকালপাত্র বোধহয় ভুলে গেলেন। তিনিও চাপা গলায় ফিসফিস করে আমাকে বললেন, এইটা একটা বালের ধর্ম! এইটা হিন্দুরাও ভালো কইরা জানে। অরা নিজেরাই মূর্তি ভাঙে…

চিন্তা করে দেখলাম, কথাটা একেবারে ফেলনা না। আমাদের কলেজের শিবিরের মেসে একটা ছেলে কুরআন ছিঁড়ে আগুন দিয়ে পাশের হিন্দুপাড়াকে ফাঁসাতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা খেয়েছিলো। তারপর সেই লোকমান যে কুরআনে হাগু দিয়ে আরেক সম্প্রদায়কে ফাঁসাতে গিয়ে পুলিশের হাতে কট খেয়েছিলো। এরা তো নিজেরা মনে করে কুরআন সরাসরি আল্লার কাছ থেকে আসছে, তারপরও এই কাজ করতে তাদের বাধে নাই… কথাগুলি দারোগা সাহেবকে বলতেই তিনি সম্বিত ফিরে বাস্তব পৃথিবীতে যেন ফিরলেন। ভালো করে চেয়ে দেখলেন আমাকে। চেহারায় ফুটে উঠলো অবজ্ঞা। এ্যাঁ, এ কার সঙ্গে তিনি কথা বলছিলেন! হেঁকে বললেন, এই পোলাটা কে, এই, এই পোলাটা কে?…

ইমাম সাব এগিয়ে আসলেন, আমার হাত ধরে বললেন, দারোগা সাব এই পোলা আমাগো এলাকার। একটু বলদ কিসিমের। এর বাবা আমাদের মসজিদ কমিটিতে আছে। মসজিদের ইলেকটিসিটি বিল এরা দেয়। আপনে এরে ছেড়ে দেন… পোলাপান মানুষ…

ইমাম সাব আমাকে নিয়ে পাড়ায় ফিরছিলেন। বাপরে আরেকটু হলে পুলিশের হাতে ফাঁসছিলাম। কৃতজ্ঞতায় আমি ইমাম সাবের পিছন পিছন ঘাড় গুজে হাঁটছিলাম। ইমাম সাব চাপা রোষে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি কি কাফের কাদিয়ানীদের পাল্লায় পড়ছো?

-জি না ইমাম সাব এসব কী কন!

-খারিজি শিয়াদের পাল্লায়?

-এদের তো আমি চিনিই না…

-তুমি মূর্তি পূজা হালাল বলে কত বড় অন্যায় করছো জানো? তুমি কাফের হয়ে গেছো! তুমি মুরতাদ হয়ে গেছো…। এখন যদি আমি এটা সবাইকে জানাই কী হবে জানো? শহর হেফাজত ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক আমি। যদি তোমারে এখন নাস্তিক বলে সবাইকে জানায় দেই তুমি মূর্তিকে হালাল বলছো তাইলে তোমার কী অবস্থা হবে বুঝতে পারছো?

-পারছি ইমাম সাব।

-কী পারছো?

-সত্য বলা যাবে না।

-কী বললা?

-বলছি আর কোনদিন আপনার মুখের উপর কথা বলবো না…

-শোন, আজকে বাদ আসর মসজিদে তুমি আমার সাথে দেখা করবা। সেখানে তোমাকে আমি নতুন করে কলেমা পড়াইয়া মুসলমান বানাবো। তুমি গোমরাহে চলে গেছিলা। শয়তান তোমাকে ধোঁকা দিছিলো। আমি তোমাকে শুধরাই দিবো… বুঝলা?…

আমি কাঁদো কাঁদো মুখ করে ইমাম সাবের কথায় সায় দিলাম। ‘দুর্বৃত্ত’ ব্যাটাকে মনে হয় এবার আমি চিনতে পেরেছি! তার জাত গোত্র ধর্ম কী সেটাও জানতে পেরেছি। যেটা বেশি করে বুঝতে পেরেছি ‘দৃর্বৃত্ত’ যে-ই হোক তার সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না। 

…নতুন করে আবার মুসলমান হবার ব্যাপারটা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লাগছে। নিশ্চয় এই মুসলমান হওয়াতে আমার কিছু পরিবর্তন আসবে। কী সেটা জানতে খুব মন চাইছে…।


©সুষুপ্ত পাঠক

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ