শুভ নববর্ষে রাষ্ট্র আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় আমি একজন নিকৃষ্ট হিন্দু
13 april 2023
✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️✍️
বাংলা নববর্ষ আসলেই আমার মনে পড়ে আমি একজন হিন্দু। আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। এটি খুব যন্ত্রনাদায়ক অভিব্যক্তি। হাজার বছরের পরম্পরাকে বিভাজিত করে রাষ্ট্র আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় হিন্দুদের নববর্ষ ১৫ই এপ্রিল আর বাঙালি মুসলমানদের নববর্ষ ১৪ই এপ্রিল। যদিও বাংলা নববর্ষ বলে কোন অনুষ্ঠানের কথা ইসলাম স্বীকৃতি দেয়না। তারা গ্রহ নক্ষত্র চন্দ্র সূর্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের এসব জটিল বিষয় বিশ্বাস করে না। তারা বিশ্বাস করে ইট-পাথরের পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরতে পারেনা বরং সূর্যই পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরে। এরমূলে রয়েছে প্রজ্ঞাবান আল্লাহর অসীম কৃপা। তার ইচ্ছেতেই সূর্য উদিত হয় এবং তার ইচ্ছেতেই সন্ধ্যেবেলা তার আরশের নীচে আশ্রয় নেয়। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানের এসব তত্ত্ব অবিশ্বাসীদের একটা প্রোপাগাণ্ডা ছাড়া আর কিছু নয়।
মুসলমান যে একটা আলাদা জাতি তার স্বাতন্ত্র্য প্রাত্যহিক প্রতিটি ক্ষেত্রে বিভাজনের মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের দিনক্ষণ নির্ধারিত হয় ৬২২ খৃষ্টাব্দে হজরত মহম্মদ যখন মক্কা থেকে মদিনাতে এসেছিলেন সেই থেকে। এই ঘটনাকে ইসলামের ইতিহাসে বলা হয় হিজরত।
তবু নববর্ষ আসলেই বাংলাদেশের কিছু অর্ধেক মুসলিম চিরাচরিত উৎসাহ উদ্দীপনায় এই দিনটি পালন করে থাকেন। এবার আবার মঙ্গল শোভাযাত্রার উপর নিষেধাজ্ঞার নোটিশ জারি হয়েছে। তবু রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে আজও নস্টালজিক হয়ে পড়ি। শৈশবের সেই দিনগুলোতে নিজেকে কখনো হিন্দু মনে হয়নি। বাঙালির চিরাচরিত পোশাক পাজামা পাঞ্জাবি আর এলো চুলে কপালে টিপ মাথায় ফুলের বাহারি সাজে বঙ্গ ললনাদের মনে হয় প্রকৃতির সবুজ বৃক্ষরাজির মিলন মেলার শ্যামলিমা তুমি অপরূপা অপ্সরী স্বাধীনতার আকাশে উদীয়মান এক রক্তিম লাল রবি যা আজ ঢাকা পড়ে গিয়েছে হিজাবের কালো অন্ধকারে। এত অন্ধত্বের পরও মঙ্গল শোভাযাত্রাকে আজও ভুলতে পারিনি। যখন বাংলার শিল্প সংস্কৃতি আচার আচরণকে হিন্দুয়ানীর ট্যাগ দেয়া হয় তখন এ বাংলাদেশকে চিনতে পারিনা। যখন বলা হয় পহেলা বৈশাখ হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি, ইলিশ নাকি হিন্দু মাছ, মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বলা হয় শয়তানের শোভাযাত্রা, বাংলায় এখন আর নেই সারি-জারি-ভাটিয়ালী-কীর্ত্তন গানের আসর। শাড়ি পরা টিপ পরা রমনীদের বলা হয় পতিতা। মাসের নামগুলো বাঙালি ঐতিহ্যকে মহিমান্বিত করেছে।
- বিশাখা থেকে বৈশাখ,
- জেষ্ঠা থেকে জৈষ্ঠ,
- আষাঢা থেকে আষাঢ়,
- শ্রবনা থেকে শ্রাবণ,
- ভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র,
- কৃত্তিকা থেকে কার্তিক,
- অগ্রাইহনী থেকে অগ্রহায়ণ,
- পুষ্যা থেকে পৌষ,
- মঘা থেকে মাঘ,
- ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন,
- চিত্রা থেকে চৈত্র
বাঙালির এই নামগুলোকে মুসলমানী করে ৪টি মাসকে একত্র করে দেয়া হয়েছে রজব-জিলক্কদ-জিলহজ্জ ও মুহররম। মুখোশ পরা, মূর্তি গড়া, ছবি আঁকা, ভাস্কর্য বানানো এ সবই নাকি হিন্দুয়ানী। নাচ, গান, থিয়েটার, সিনেমা, বসন্ত উৎসব, রঙ খেলা, প্রদীপ জ্বালানো, পুস্প স্তবক অর্পন এসব নাকি হিন্দু সংস্কৃতি। তাহলে বাঙালির আর কি অবশিষ্ট থাকে বলতে পারেন? জানি একদিন এ সব কিছুই থাকবে না পড়ে থাকবে শুধু বাঙালির কংকালসার চেহারাটা।
বাঙালি তার নিজের স্বাতন্ত্র্যটুকুও বজায় রাখতে পারেনি। ডঃ মেঘনাদ সাহার একটি পর্যবেক্ষণকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নিজের অস্তিত্বটুকু বিকিয়ে দিয়েছে। মূল উদ্দেশ্য বিভাজন। তাই রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলামের সাথে সাজুয্য রেখে হিসেবের সুবিধার জন্য প্রথম ৫ মাস ৩১ দিনে এবং পরের ৭ মাস করা হয়েছে ৩০ দিনে। এই তুঘলকি হিসাব বাঙালির গর্ব আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিনটিও ঠিক রাখতে পারেনি। ৮ই ফাল্গুনের জায়গায় করতে হয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারী। এ লজ্জা রাখি কোথায়।
অনেকে বলেন আকবরের সময় প্রথম বাংলা বর্ষপঞ্জি শুরু হয়েছিল। কিন্তু আকবরের সময়ের অনেক শতক আগে নির্মিত দুটি শিবমন্দিরে বঙ্গাব্দ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া গিয়েছিল। আর এটাই নির্দেশ করে আকবরের বহু সময় আগে বাংলা বর্ষপঞ্জির অস্তিত্ব ছিল। বৈদিক যুগ থেকেই হিন্দু বর্ষ পঞ্জিকার প্রচলন শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ৫ম/৬ষ্ঠ/এবং ৭ম শতাব্দীতে যথাক্রমে আর্যভট্ট-বরাহমিহির ও ভাস্করের মতো জ্যোতির্বিজ্ঞানী অনেক অবদান রেখেছেন। এছাড়া ১০ম শতাব্দীতে সূর্য সিদ্ধান্ত নামে একটা গ্রন্থ হিন্দু পঞ্জিকা গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছিলেন। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সৌরদিন গননা শুরু হয়। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরে আসতে ৩৬৫ দিন কয়েক ঘন্টা সময় প্রয়োজন হয়। এই সময়টাই এক সৌর বছর। আকাশে রাশি মন্ডলীতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে বঙ্গাব্দের মাসের হিসেব হয়ে থাকে। যেমন যে সময় সূর্য মেষ রাশিতে থাকে সে মাসের নাম হয়েছে বৈশাখ। ঠিক এমনি ভাবে প্রতিটি মাস নির্ধারিত হয়েছে সূর্যের অবস্থানের নিরিখে। এটাই জ্যোতির্বিজ্ঞান যা ইসলাম শিকার করে না। তাই আমরা রওনা দিয়েছি এক অজানা মরু প্রান্তরে যার কোন ঠিকানা নেই।
(শুভ নববর্ষের প্রীতি শুভেচ্ছা ও প্রণাম জানাই শ্রেনী ভেদে। সময়টা ভালো যাচ্ছেনা চোখের সমস্যা এখনো কাটেনি, সবার আশীর্বাদ কামনা করছি। সবাই ভাল থাকবেন)
0 মন্তব্যসমূহ